সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
Logo

হাসিনার প্রশ্নে হঠাৎ কঠোর ভারত, ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে তৎপর দিল্লি

নিউজ ডেস্ক

দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে একটি পুরোনো প্রবাদ বহুল প্রচলিত—এ অঞ্চলে কোনো রাষ্ট্রের স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী প্রতিপক্ষ নেই; স্থায়ী থাকে কেবল জাতীয় স্বার্থ। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি যেন সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

একসময় শেখ হাসিনা সরকারের অন্যতম ঘনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক অংশীদার হিসেবে পরিচিত ভারত এখন এমন এক কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছে, যা অনেক বিশ্লেষকের কাছে নীতিগত পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত বহন করছে। ভারতের সংসদীয় কমিটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা, শেখ হাসিনার অবস্থান নিয়ে দিল্লির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, প্রত্যর্পণ অনুরোধ পর্যালোচনার বিষয়, বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া স্বাভাবিক করার সুপারিশ, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের আহ্বান এবং বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে প্রকাশ্য আগ্রহ—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়: দিল্লি ব্যক্তি-নির্ভর সম্পর্কের পরিবর্তে রাষ্ট্রভিত্তিক ও বাস্তববাদী কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিতে চাইছে।

শেখ হাসিনা চলতি বছরের শেষ দিকে বাংলাদেশে ফিরতে পারেন—এমন রাজনৈতিক বক্তব্য আলোচনায় আসার পর ভারত সরকার সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে, ভারতের ভূখণ্ড থেকে তাকে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো প্রত্যর্পণ অনুরোধ প্রচলিত আইন, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং প্রযোজ্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক কূটনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা। কারণ ভারত একদিকে মানবিক আশ্রয়ের নীতি বজায় রাখার কথা বলছে, অন্যদিকে তার ভূখণ্ড অন্য কোনো দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ব্যবহার করতে না দেওয়ার অবস্থানও পুনর্ব্যক্ত করছে।

বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের বক্তব্য—শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে—স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারভুক্ত। রাজনৈতিক বক্তব্যকে বিচারিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা সমীচীন নয়।

ভারতের সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে বলা হয়েছে, গুরুতর মানবিক সংকটে পড়া ব্যক্তিদের আশ্রয় দেওয়া ভারতের দীর্ঘদিনের নীতির অংশ। তবে সেই আশ্রয়কে অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।

আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকেও এ ধরনের অবস্থান নতুন নয়। যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানিসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আশ্রয়প্রাপ্ত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা আরোপ করে থাকে। তবে পুরো ঘটনাকে শুধু শেখ হাসিনাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করলে বৃহত্তর বাস্তবতা আড়ালে থেকে যাবে।

এর পেছনে রয়েছে আরও বড় ভূরাজনৈতিক হিসাব।

বাংলাদেশ এখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত রাষ্ট্র। বঙ্গোপসাগর, আঞ্চলিক সমুদ্রপথ, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, জাপানের অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক সংযোগ—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশ।

ভারত ভালোভাবেই জানে, বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল ও কার্যকর সম্পর্ক ছাড়া তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আঞ্চলিক বাণিজ্য, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক কৌশলগত পরিকল্পনা পূর্ণতা পাবে না। একইভাবে বাংলাদেশও উপলব্ধি করে, ভারতের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক ছাড়া আঞ্চলিক সংযোগ, জ্বালানি সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং বাণিজ্যিক সুবিধার অনেক ক্ষেত্র সীমিত হয়ে পড়তে পারে।

এই বাস্তবতায় ভারতের সংসদীয় কমিটির আরেকটি সুপারিশ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কমিটি বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া দ্রুত স্বাভাবিক করার আহ্বান জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ভিসা সীমিত থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কূটনীতিতে জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বা ‘পিপল-টু-পিপল কন্টাক্ট’ সম্পর্ক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা, পর্যটন ও সাংস্কৃতিক বিনিময়—সব ক্ষেত্রেই ভিসা সহজীকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের পাশাপাশি জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়লে আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিও শক্তিশালী হয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটে ভারতের সংসদীয় কমিটি দ্রুত নবায়ন আলোচনা শুরু করার সুপারিশ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদীর প্রবাহ, বৃষ্টিপাতের ধরন এবং পানির প্রাপ্যতায় পরিবর্তন আসছে। ফলে আগের তথ্য ও বাস্তবতার পরিবর্তে আধুনিক জলবিজ্ঞান, পরিবেশগত পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে নতুন কাঠামোয় আলোচনা জরুরি।

একইভাবে তিস্তার পানি বণ্টনও দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্য—“এমন কোনো সমস্যা নেই যার সমাধান সম্ভব নয়”—কূটনৈতিকভাবে আশাব্যঞ্জক। তবে বাস্তব অগ্রগতির জন্য দিল্লির পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর ভূমিকা অপরিহার্য।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে দিল্লির প্রকাশ্য আগ্রহও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সফরটি অনুষ্ঠিত হলে তা শুধু একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।

সম্ভাব্য আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পারে তিস্তা ও গঙ্গার পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য ঘাটতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা, রেল ও সড়ক যোগাযোগ, বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা। এসব ইস্যুতে বাস্তবসম্মত অগ্রগতি হলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আস্থা ও কার্যকারিতা আরও বাড়তে পারে।

ভারত কেন এখন ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে এতটা আগ্রহী—এর উত্তরও ভূরাজনীতির মধ্যেই নিহিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন বাংলাদেশে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, শিল্পাঞ্চল ও যোগাযোগ খাতে বড় বিনিয়োগ করেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে তার কৌশলগত উপস্থিতি জোরদার করছে।

এই প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশ একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করছে। দিল্লি চায় না, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের কোনো শূন্যতা অন্য কোনো শক্তি পূরণ করুক। ফলে ঢাকার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি, স্থিতিশীল ও পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক ভারতের কৌশলগত হিসাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অর্থনৈতিক বাস্তবতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভারত বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার। আবার বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের জন্য একটি বড় রপ্তানি বাজার। সীমান্ত বাণিজ্য, বিদ্যুৎ সহযোগিতা, নৌ ও রেল যোগাযোগ, আঞ্চলিক ট্রানজিট এবং শিল্প সহযোগিতা—সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে।

রাজনৈতিক দূরত্ব শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ককেই প্রভাবিত করে না; এটি অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সংযোগকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই দুই দেশের জন্যই মতপার্থক্যকে সংঘাতের পর্যায়ে না নিয়ে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা জরুরি।

আজকের আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় সফল কূটনীতি ব্যক্তি-নির্ভর নয়; বরং প্রতিষ্ঠান, পারস্পরিক স্বার্থ এবং রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সে কারণেই দিল্লি এখন বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ককে নতুনভাবে বিন্যস্ত করার চেষ্টা করছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশেরও উচিত জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা, যেখানে প্রতিবেশীর সঙ্গে সহযোগিতা থাকবে, আবার সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ও কৌশলগত স্বাধীনতাও অটুট থাকবে।

পরিশেষে বলা যায়, ভারতের সাম্প্রতিক অবস্থানকে শুধু শেখ হাসিনাকে ঘিরে নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। এর পেছনে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত শক্তির ভারসাম্য, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সংযোগের বাস্তবতা।

বাংলাদেশের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। সমতা, পারস্পরিক সম্মান এবং বাস্তববাদী কূটনীতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্কই দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের জনগণের জন্য সর্বাধিক কল্যাণকর হতে পারে।

ইতিহাসের শিক্ষা হলো—ব্যক্তি আসে, ব্যক্তি যায়; সরকার পরিবর্তিত হয়; কিন্তু রাষ্ট্রের স্বার্থ অটুট থাকে। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কও যদি ব্যক্তি-নির্ভরতার গণ্ডি পেরিয়ে সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্রকেন্দ্রিক, পারস্পরিক মর্যাদাসম্পন্ন এবং জনগণমুখী অংশীদারত্বে রূপ নেয়, তবে সেটিই হবে দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও শান্তির জন্য সবচেয়ে ইতিবাচক বার্তা।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন