রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

রাষ্ট্রপতি পদে আলোচনায় এখন তিন নাম

নিউজ ডেস্ক

নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে ব্যাপক আলোচনা। গত কয়েক দিন ধরে এক ডজনের বেশি নাম আলোচনায় এলেও দলীয় ও রাজনৈতিক পর্যায়ে শেষ পর্যন্ত তিনজনের নামই বেশি উচ্চারিত হচ্ছে।

রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. আবদুল মঈন খান এবং দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম আলোচনায় রয়েছে।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, শনিবার (১ আগস্ট) বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়টি উঠতে পারে। তবে একাধিক সূত্রের দাবি, বিষয়টি আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচিতে নাও থাকতে পারে।

সে ক্ষেত্রে অতীতের মতো স্থায়ী কমিটির সদস্যরা রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী নির্বাচনের সিদ্ধান্ত দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে মত দিতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে কেউ কেউ বিষয়টি বৈঠকে উত্থাপন করতে পারেন বলেও দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, সম্ভাব্য প্রার্থীদের রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও ব্যক্তিগত প্রোফাইল ইতোমধ্যে উচ্চপর্যায়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

কোন বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে

দলীয় আলোচনা সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্রের দাবি, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু দলীয় রাজনীতি নয়; দেশের সামগ্রিক কূটনৈতিক ভারসাম্য, সাংবিধানিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিভিন্ন পর্যায় থেকে নানা মতামত থাকলেও শেষ পর্যন্ত এমন একজনকে বেছে নেওয়ার চিন্তা রয়েছে, যিনি দেশ-বিদেশে গ্রহণযোগ্য, অভিজ্ঞ এবং বিতর্কের ঊর্ধ্বে বলে বিবেচিত হন।

অধ্যাপক ড. আবদুল মঈন খান

সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে অধ্যাপক ড. আবদুল মঈন খানের নাম বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। পদার্থবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা, নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞানে গবেষণা, আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ, পরিকল্পনা, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে তার প্রোফাইলকে শক্তিশালী হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতে তার দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততাও রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তাকে আলোচনায় রেখেছে।

হাফিজ উদ্দিন আহমেদ

অন্যদিকে, হাফিজ উদ্দিন আহমেদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও সংসদীয় অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকায় রাষ্ট্র পরিচালনা ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাও আলোচনায় রয়েছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বে উঠে আসা এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলো বিবেচনায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তবে বিএনপির দায়িত্বশীল কোনো নেতা এখনো রাষ্ট্রপতি পদে কারও নাম আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেননি। নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরই দল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করতে পারে বলে সূত্রগুলোর দাবি।

ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চললেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সিদ্ধান্তের ওপর।

আজ কী সিদ্ধান্ত আসতে পারে?

স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেন, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয়েছে। ভবিষ্যতে কে রাষ্ট্রপতি হতে পারেন, এ বিষয়ে আলোচনা হওয়া খুবই স্বাভাবিক।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে কী কী বিষয় বিবেচনায় রাখা উচিত—এমন প্রশ্নে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রাজনীতি বিশ্লেষক মোবাশ্বের হোসেন টুটুল আটটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন।

তার মতে, রাষ্ট্রপতির পাঁচ বছরের মেয়াদ, সম্ভাব্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তার ভূমিকা, রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা, অতীত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সর্বজনস্বীকৃত ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাগত ও কূটনৈতিক যোগ্যতা, বর্তমান সরকার ও দলের সাংগঠনিক বাস্তবতা এবং রাষ্ট্রপতির শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা—সব বিষয়ই সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, “সব বিষয় বিবেচনায় নিলে বর্তমান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে দু-একজন ছাড়া কাউকে এ পদে বিবেচনা করা দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হবে বলে আমি মনে করি না। তবে ক্ষমতায় বসলে অধিকাংশ মানুষেরই আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু এর পরিণতি অধিকাংশ সময় ভালো হয়েছে—এমন প্রমাণ নেই। তাই আবেগের চেয়ে যুক্তিকে প্রাধান্য দিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন খান বলেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে এমন একজনকে বেছে নেওয়া উচিত, যার কোনো অগ্রহণযোগ্য অতীত নেই, দুর্নীতির অভিযোগ নেই, রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা রয়েছে এবং যার ব্যক্তিত্ব ও অবস্থান দৃঢ়।

তার মতে, বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভাকে অনেক সময় অভিভাবকশূন্য মনে হয়। তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে অবসরপ্রাপ্ত কোনো জ্যেষ্ঠ বিচারপতির মতো অভিজ্ঞ ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কাউকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বিবেচনা করা হলে সরকার ও রাষ্ট্র—উভয়ই উপকৃত হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, দলীয়ভাবে কাউকে রাষ্ট্রপতি করা হলে এমন একজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে বেছে নেওয়া উচিত, যার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ নেই এবং যার একটি স্বচ্ছ ভাবমূর্তি রয়েছে।

তবে দুই যুগ আগে সরকারে থাকাকালে বিএনপি যাদের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছিল—বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও ইয়াজউদ্দিন আহমদের মতো বিতর্কিত অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি এড়ানো উচিত বলেও মত দেন তিনি।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা যতই বাড়ুক, শেষ পর্যন্ত দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত এবং নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণার পরই সম্ভাব্য প্রার্থী সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন