রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

অভিযুক্ত শেখ হাসিনাসহ ৫০, সত্যতা মেলেনি ৪৯ জনের বিরুদ্ধে

নিউজ ডেস্ক

রাজধানীর মিরপুর-১০ গোলচত্বরে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় রাকিব হোসেন (২৯) নিহতের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৫০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। মামলায় নাম থাকা ৪৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. মমিনুল ইসলাম গত ১৩ জুলাই আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।

তিনি জানান, ঘটনার সার্বিক তদন্ত ও প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে ৫০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ঘটনার সময় মিরপুর এলাকায় উপস্থিত না থাকা এবং অসৎ উদ্দেশ্যে এজাহারে নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাওয়ায় ৪৯ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিদের মধ্যে রয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ, পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার বিপ্লব কুমার, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক সংসদ সদস্য মাইনুল হোসেন খান নিখিল, কামাল আহমেদ মজুমদার ও ইলিয়াস মোল্লা।

এ ছাড়া মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা এস এম মান্নান কচি, এখলাস উদ্দিন মোল্লা এবং সাবেক কাউন্সিলর কাসেম মোল্লার নামও অভিযোগপত্রে রয়েছে।

অন্যদিকে, অব্যাহতির সুপারিশ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন খান, কুষ্টিয়া-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য কামরুল আরেফিন, পাবনা-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য গালিবুর রহমান শরিফ, আলোক হেলথকেয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. লোকমান হোসেন এবং গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ইলিয়াস আহমেদ তালুকদার।

অভিযোগপত্রে যা বলা হয়েছে

অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, ২০১৮ সালের ১২ জুলাই জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরকারি প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিল করা হয়। পরে ২০২৪ সালের ৫ জুন উচ্চ আদালত ওই প্রজ্ঞাপনকে অবৈধ ঘোষণা করলে কোটা পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়।

এর ধারাবাহিকতায় কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। পরবর্তী সময়ে আন্দোলন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা আন্দোলন দমনে ভূমিকা রাখেন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া এবং উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, এজাহারভুক্ত আসামি শেখ হাসিনার সঙ্গে অভিযোগপত্রভুক্ত অন্য আসামিরা গোপন বৈঠক করে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনের বিষয়ে নির্দেশনা দেন বলে তদন্তে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা ও পুলিশ কর্মকর্তারা আন্দোলন দমনে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন এবং ছাত্র-জনতার আন্দোলন সহিংসভাবে থামানোর লক্ষ্যে পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন সম্ভব হয়নি

তদন্তকালে রাকিব হোসেনের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে ময়নাতদন্ত করানোর জন্য আদালতে আবেদন করা হয়। আদালতের নির্দেশে হরিণাকুণ্ডু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়ম অনুযায়ী মরদেহ উত্তোলনের জন্য কবরস্থানে যান।

তবে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের আপত্তির কারণে কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

যেভাবে নিহত হন রাকিব

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই রাকিব হোসেন আন্দোলনে অংশ নেন।

ওই দিন রাত ৯টার দিকে আন্দোলনকারীদের একটি মিছিল মিরপুর-১০ গোলচত্বরে পৌঁছালে সেখানে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, অজ্ঞাত ব্যক্তির ছোড়া গুলিতে রাকিবের গলার বাঁ পাশে আঘাত লাগে।

পরে উপস্থিত লোকজন তাকে নিকটস্থ ড. আজমল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাত ৯টা ১৫ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে মামলার বাদী ও রাকিবের বাবা মো. আবু বক্কর সিদ্দিক ঝিনাইদহ থেকে ঢাকায় আসেন। পরে রাত ১টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহ নিয়ে তিনি ঝিনাইদহের উদ্দেশে রওনা হন।

মামলার নথি অনুযায়ী, তৎকালীন পরিস্থিতিতে সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত ছাড়াই ২০ জুলাই ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার বাসুদেবপুর পারিবারিক কবরস্থানে রাকিবের মরদেহ দাফন করা হয়।

পরে একই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর মিরপুর মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন রাকিবের বাবা।

‘আমি ন্যায়বিচার চাই’

মামলার বাদী মো. আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, রাকিব ছিলেন তার দুই ছেলের মধ্যে ছোট। তিনি মিরপুর ক্যান্টনমেন্টে অবস্থিত মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি) থেকে ২০২১ সালে যন্ত্রকৌশলে স্নাতক সম্পন্ন করেন।

পরে তিনি সুপার জুট মিলের বনানী প্রধান কার্যালয়ে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি মিরপুর-১১ এলাকার একটি মেসে থাকতেন।

রাকিবের মৃত্যুর খবর তার বন্ধুরা ফোনে জানান বলে উল্লেখ করেন তার বাবা।

অভিযোগপত্র দাখিলের বিষয়ে তিনি আগে থেকে অবগত ছিলেন না জানিয়ে আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, “সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাদের যেন সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়। আমি ন্যায়বিচার চাই।”

তবে অভিযোগপত্র দাখিলের অর্থ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন