ইরান-ইসরায়েল সংঘাত একসময় পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ায় সেই আশঙ্কা আরও গভীর হয়। শুরু হয় হামলা-পাল্টা হামলা। সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে ইরানের কৌশলও। প্রথম দিকে কিছুটা সংযত অবস্থানে থাকলেও এখন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে হামলার পরিধি বাড়িয়েছে তেহরান।
ইরানের দাবি, তারা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতেও হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলো আর নীরব থাকতে চাইছে না। কোনো কোনো দেশ সামরিক পদক্ষেপের বিষয়টিও বিবেচনা করছে। এরই মধ্যে সৌদি আরব ইরাক ও ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ইরান ও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা মোকাবিলা এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে রিয়াদ।
ইরান ও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ডের কারণে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চলাচল প্রায় বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে নতুন করে এক ধরনের মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে বাড়ছে আঞ্চলিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে নিয়মিত পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে।
এই সংঘাত আরও বড় আকারে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। কারণ উপসাগরীয় দেশগুলো যেকোনো মূল্যে নিরাপদ বাণিজ্যপথ পুনরুদ্ধার করতে চায়।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের নৌপথ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে ইরান এ বিষয়ে ছাড় দিতে রাজি নয়। তেহরানের দাবি, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা ও সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে নিতে হবে। অন্যথায় ইরানে হামলার জন্য যেসব দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করা হবে, সেসব দেশও হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান।
এত দিন সৌদি আরব সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চললেও বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশটিকে সামরিক পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফলে বড় প্রশ্ন উঠেছে—ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে গেলে সৌদি আরব কতটা সক্ষম? সামরিক শক্তির দিক থেকে দুই দেশের অবস্থানই বা কেমন?
সামগ্রিক সামরিক শক্তিতে এগিয়ে ইরান
২০২৬ সালের গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার (জিএফপি) সূচক অনুযায়ী, সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতায় সৌদি আরবের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে ইরান।
বিশ্বের ১৪৫টি দেশের সামরিক শক্তির তালিকায় ইরানের অবস্থান ১৬তম। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে ইসরায়েলের পরেই রয়েছে ইরান।
অন্যদিকে সৌদি আরবের অবস্থান ২৫তম।
জিএফপির পাওয়ারইনডেক্সে ইরানের স্কোর ০ দশমিক ৩১৯৯। সৌদি আরবের স্কোর ০ দশমিক ৪৪৭৩। এই সূচকে স্কোর যত শূন্যের কাছাকাছি থাকে, সংশ্লিষ্ট দেশের সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা তত শক্তিশালী হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘাতের কারণে ইরানের সামরিক সক্ষমতা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সামরিক জনবলে বড় ব্যবধান
জিএফপির তথ্য অনুযায়ী, ইরানের জনসংখ্যা প্রায় ৮ কোটি ৮৩ লাখ। দেশটিতে সামরিক দায়িত্ব পালনের উপযোগী জনশক্তি প্রায় ৪ কোটি ৯৫ লাখ।
অন্যদিকে সৌদি আরবের জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৬৫ লাখ। দেশটিতে সামরিক দায়িত্ব পালনের উপযোগী জনশক্তি প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ।
সামরিক বয়সে পৌঁছানো মানুষের সংখ্যাতেও ইরান এগিয়ে। দেশটিতে প্রতি বছর প্রায় ১৪ লাখ মানুষ সামরিক বয়সে পৌঁছান। সৌদি আরবে এ সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ২১ হাজার।
সক্রিয় সেনাসদস্যে এগিয়ে তেহরান
ইরানের মোট সামরিক সদস্য প্রায় ১১ লাখ ৮০ হাজার। এর মধ্যে সক্রিয় সদস্য প্রায় ৬ লাখ ১০ হাজার এবং রিজার্ভ সদস্য প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার।
অন্যদিকে সৌদি আরবের মোট সামরিক সদস্য প্রায় ৩ লাখ ৯৭ হাজার। এর মধ্যে সক্রিয় সদস্য প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার।
জিএফপির তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের রিজার্ভ সদস্যের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি।
অর্থাৎ সক্রিয় সামরিক সদস্যের সংখ্যায় ইরান সৌদি আরবের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে।
স্থলবাহিনীতে ইরানের বড় সুবিধা
ইরানের স্থলবাহিনীতে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার সদস্য রয়েছেন। দেশটির বিমানবাহিনীতে প্রায় ৩৭ হাজার এবং নৌবাহিনীতে প্রায় ২০ হাজার সদস্য রয়েছেন।
অন্যদিকে সৌদি আরবের স্থলবাহিনীতে প্রায় ৭৫ হাজার সদস্য রয়েছে। দেশটির বিমানবাহিনীতে প্রায় ৩০ হাজার এবং নৌবাহিনীতে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ সদস্য রয়েছেন।
সামরিক জনবলের দিক থেকে বিশেষ করে স্থলবাহিনীতে ইরানের বড় সুবিধা রয়েছে।
আধাসামরিক বাহিনীতেও এগিয়ে ইরান
আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যসংখ্যার ক্ষেত্রেও ইরানের অবস্থান শক্তিশালী।
ইরানে আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার। অন্যদিকে সৌদি আরবে এ সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার।
ফলে সামরিক ও আধাসামরিক জনবলের হিসাবে ইরানের সক্ষমতা তুলনামূলক বেশি।
তিন দিক থেকে নিরাপত্তা চাপে সৌদি আরব
বর্তমানে সৌদি আরবকে একসঙ্গে তিনটি দিক থেকে নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
একদিকে ইরান, অন্যদিকে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী এবং ইরাকের সশস্ত্র মিলিশিয়ারা রিয়াদের জন্য উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সম্প্রতি হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ইরাক থেকে ড্রোন হামলা এবং ইরানের নতুন হুঁশিয়ারির পর সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে পূর্ব ইরাকে বিমান হামলা চালিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া মার্চের শেষ দিকে সৌদি বিমানবাহিনী ইরানের ভেতরে গোপন প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়েছিল বলেও কয়েকটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে এ বিষয়ে সৌদি আরব বা ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য নিশ্চিত করেনি।
বাণিজ্যপথ রক্ষায় নতুন সামুদ্রিক জোট
বাব আল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে নৌ চলাচল নিরাপদ রাখতে বাংলাদেশসহ ১৩টি দেশকে নিয়ে নতুন সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরব।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ নামে গঠিত এ জোটের লক্ষ্য সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
জোটভুক্ত দেশগুলো জানিয়েছে, বাব আল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখতে তারা একসঙ্গে কাজ করবে।
এই জলপথগুলো ভারত মহাসাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডর হিসেবে বিবেচিত।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উদ্বেগ বাড়ার সময় এ জোট গঠনের ঘোষণা এলো।
বিশ্বের তেল ও গ্যাস রপ্তানির উল্লেখযোগ্য অংশ একসময় হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। সেখানে নৌ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে।
আঞ্চলিক দেশগুলোকে ইরানের কঠোর সতর্কবার্তা
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক জোট বা সহযোগিতা করা এবং ওয়াশিংটনকে নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া আঞ্চলিক দেশগুলোকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে ইরান।
দেশটির খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলী আবদোল্লাহি বলেছেন, কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নিলে বা ওয়াশিংটনের জন্য ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহৃত হলে সেই দেশকেও যুদ্ধের পরিণতি ভোগ করতে হবে।
তিনি অভিযোগ করেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমেই আরও যুদ্ধংদেহী নীতি অনুসরণ করছে।
তার দাবি, এর মাধ্যমে পুরো অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার এবং নিজেদের প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।
আবদোল্লাহি আরও অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্য পূরণে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর অর্থ, সম্পদ, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও কৌশলগত সক্ষমতাকে ব্যবহার করছে।
একই সঙ্গে ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
কোন দিকে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য?
সামগ্রিক সামরিক জনবল ও প্রচলিত সামরিক সক্ষমতার হিসাবে ইরান এগিয়ে থাকলেও আধুনিক যুদ্ধবিমান, উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, পশ্চিমা অস্ত্রব্যবস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ মিত্রদের সম্ভাব্য সহায়তা সৌদি আরবকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে।
তাই ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে সরাসরি সংঘাত শুরু হলে শুধু সামরিক সদস্য বা অস্ত্রের সংখ্যা দিয়ে সম্ভাব্য ফল নির্ধারণ করা কঠিন।
সংঘাতের গতিপথ নির্ভর করবে আঞ্চলিক জোট, আকাশ প্রতিরক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, নৌপথ নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বহিরাগত শক্তিগুলোর ভূমিকার ওপর।
তবে হরমুজ প্রণালি, লোহিত সাগর ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা আরও বাড়লে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন ও আরও বিস্তৃত মাত্রা নিতে পারে।

