রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

ভাষার মৃত্যু: হারিয়ে যাচ্ছে হাজার বছরের ইতিহাস

নিউজ ডেস্ক

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ৭ হাজার ৫০০ ভাষা প্রচলিত রয়েছে। ইংরেজি, মান্দারিন চীনা, হিন্দি, স্প্যানিশ, আরবি ও ফরাসিসহ কয়েকটি ভাষায় কথা বলেন বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ। তবে নতুন এক গবেষণা বলছে, মানব ইতিহাসের এক সময়ে পৃথিবীতে একসঙ্গে ৩০ হাজার থেকে ৭৫ হাজারেরও বেশি ভাষার অস্তিত্ব ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব ভাষার বড় একটি অংশ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক ক্লেয়ার বাওয়ার্ন এবং স্পেনের ক্যাটালান ইনস্টিটিউটের বিবর্তনীয় নৃবিজ্ঞানী ড্যামিয়ান ব্লাসির যৌথ নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স-এ।

গবেষকরা গাণিতিক মডেলিং, নৃবিজ্ঞান, ভাষাবিজ্ঞান এবং বিভিন্ন সময়ের জনসংখ্যার উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ভাষার অতীত বৈচিত্র্য সম্পর্কে নতুন ধারণা দিয়েছেন।

গবেষণা অনুযায়ী, খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দ থেকে খ্রিষ্টীয় প্রথম সহস্রাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে পৃথিবীতে একই সময়ে ৩০ হাজার থেকে ৭৫ হাজারেরও বেশি ভিন্ন ভাষা ব্যবহৃত হতো।

যেভাবে বেড়েছিল ভাষার বৈচিত্র্য

প্রায় ১২ হাজার বছর আগে হোলোসিন যুগের শুরুতে মানুষ ছোট ছোট যাযাবর ও শিকারি গোষ্ঠীতে বসবাস করত। সে সময় বিশ্বে আনুমানিক ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার ২০০ ভাষা প্রচলিত ছিল বলে গবেষকদের ধারণা।

পরবর্তীতে কৃষিকাজের বিকাশ এবং স্থায়ী বসতি গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মানবসংখ্যা বাড়তে থাকে। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভৌগোলিক ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হওয়ায় নতুন নতুন ভাষা ও ভাষারূপের জন্ম হয়।

খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দে মেসোপটেমিয়ায় সুমেরীয় কিউনিফর্ম লিপির মাধ্যমে ভাষার লিখিত রূপের সূচনা হয়। পরে মিসর, চীন ও মেসোআমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বতন্ত্রভাবে লিখনপদ্ধতির বিকাশ ঘটে।

সাম্রাজ্য বিস্তারে হারিয়ে গেছে বহু ভাষা

গবেষকদের মতে, বড় বড় সাম্রাজ্যের বিস্তার, রাজনৈতিক আধিপত্য এবং পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে পৃথিবীর ভাষাগত বৈচিত্র্য দ্রুত কমতে শুরু করে।

ড্যামিয়ান ব্লাসি বলেন, কয়েক হাজার বছর আগে পৃথিবী সাংস্কৃতিক ও ভাষাগতভাবে কতটা বৈচিত্র্যময় ছিল, তা বর্তমান সময়ে অনেকের কাছেই কল্পনা করা কঠিন।

অধ্যাপক ক্লেয়ার বাওয়ার্নের মতে, কোনো ভাষা সাধারণত দুটি প্রধান কারণে বিলুপ্ত হয়। একটি হলো ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর হত্যা, উচ্ছেদ বা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া। অন্যটি হলো রাজনৈতিক, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক চাপে একটি জনগোষ্ঠীকে নিজেদের ভাষা ছেড়ে অন্য ভাষা গ্রহণে বাধ্য করা।

তবে সব ভাষা সরাসরি বিলুপ্ত হয়নি। অনেক প্রাচীন ভাষা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে নতুন ভাষার জন্ম দিয়েছে। যেমন, প্রাচীন লাতিন ভাষা থেকে ফরাসি, ইতালীয়, স্প্যানিশসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি আধুনিক ভাষার বিকাশ ঘটেছে।

গবেষকদের মতে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ভাষাগত আধিপত্যও বহু স্থানীয় ভাষাকে বিলুপ্তির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলে ঔপনিবেশিক ভাষা প্রশাসন, শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় প্রাধান্য পাওয়ায় স্থানীয় ভাষাগুলো ধীরে ধীরে ব্যবহারের ক্ষেত্র হারিয়েছে।

তবে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ইনকা, মায়া ও অ্যাজটেক সভ্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ভাষা আজও টিকে আছে।

বিলুপ্তির ঝুঁকিতে বিশ্বের অর্ধেক ভাষা

গবেষকদের আশঙ্কা, বর্তমানে পৃথিবীতে ব্যবহৃত ভাষাগুলোর প্রায় অর্ধেকই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।

অধ্যাপক বাওয়ার্ন বলেন, বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ মাত্র ১০ শতাংশ ভাষায় কথা বলে। ফলে বাকি ৯০ শতাংশ ভাষার অধিকাংশই ছোট ছোট জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এসব ভাষার অনেকগুলোর বক্তাসংখ্যা দ্রুত কমছে।

ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, ভাষা শুধু ভাব বিনিময়ের মাধ্যম নয়। একটি ভাষার মধ্যে একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, স্মৃতি, সংস্কৃতি, লোকজ জ্ঞান, জীবনধারা ও বিশ্বকে দেখার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি সংরক্ষিত থাকে।

তাই একটি ভাষার বিলুপ্তি শুধু কিছু শব্দ হারিয়ে যাওয়া নয়; বরং মানবসভ্যতার জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের একটি অনন্য অধ্যায় চিরতরে হারিয়ে যাওয়া।

গবেষকদের মতে, বিপন্ন ভাষাগুলো সংরক্ষণে দ্রুত নথিভুক্তকরণ, মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা, ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভাষা ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন