২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, অর্থাৎ ৩৫ জুলাই ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে এক উত্তাল ও রক্তক্ষয়ী দিন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে সারা দেশে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে সংঘর্ষ ও সহিংসতায় অন্তত ৯৩ জন নিহত হন। একই দিনে ৬ আগস্টের পরিবর্তে এক দিন এগিয়ে ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন আন্দোলনের সমন্বয়করা।
এর আগে ৩ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের দাবিতে এক দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। আন্দোলন সফল করতে ছাত্র-জনতার জন্য ১৫ দফা নির্দেশনাও দেওয়া হয়। পরে ৬ আগস্ট ঢাকামুখী কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হলেও দেশজুড়ে ব্যাপক প্রাণহানি এবং দমন-পীড়নের প্রেক্ষাপটে তা এক দিন এগিয়ে ৫ আগস্ট নির্ধারণ করা হয়।
রাজধানীর শাহবাগে বিকেল ৩টার দিকে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের রাস্তায় নামিয়ে দেশে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও গন্তব্য এক—বিজয় ছাড়া কিছু নয়। আমরা এখনো সময় দিচ্ছি। সরকার যদি সহিংসতা চালিয়ে যেতে থাকে, আমরা জানিয়ে দিতে চাই, আমরা গণভবনের দিকে তাকিয়ে আছি।’
আন্দোলনকারীদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও গুলি চালানো অব্যাহত থাকলে আন্দোলনকারীরা নীরব থাকবে না। সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
নিহতদের মরদেহ নিয়ে শাহবাগে মিছিল
সন্ধ্যা ৬টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে নিহতদের মরদেহ নিয়ে মিছিল বের করেন আন্দোলনকারীরা। মিছিলটি ঢামেক থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি হয়ে শাহবাগ পর্যন্ত যায়।
মিছিলে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতা ‘আমার ভাই মরলো কেন, শেখ হাসিনা জবাব চাই’, ‘লড়াই, লড়াই, লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই’ এবং ‘দফা এক, দাবি এক—শেখ হাসিনার পদত্যাগ’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।
মিছিলটি শাহবাগ থানার সামনে পৌঁছালে পুলিশ দাবি করে, কিছু আন্দোলনকারী থানাকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এরপর পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে মিছিল ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
সকাল শান্ত, দুপুরে ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা
ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ৪ আগস্ট সকালটা তুলনামূলক শান্ত থাকলেও দুপুরের দিকে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে সরকারপন্থি সমর্থকেরা মাঠে নামলে বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ শুরু হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তত ২০টি জেলায় সরকারপন্থি কর্মী ও পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে অন্তত ৯৩ জন নিহত হন। ইংরেজি দৈনিক নিউ এজও জানায়, শুধু ৪ আগস্টেই সারা দেশে ৯৩ জনের প্রাণহানি ঘটে।
সহিংসতা চরমে পৌঁছালে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে পাঁচজন নিহত হন। রাজধানী ঢাকায় অন্তত ১২ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। তাদের অধিকাংশকে মৃত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ঢাকার বাইরে লক্ষ্মীপুরে অন্তত আটজন, ফেনীতে আটজন, রংপুরে চারজন, বগুড়ায় পাঁচজন, সিলেটে চারজন, পাবনায় তিনজন, মুন্সিগঞ্জে তিনজন, মাগুরায় চারজন, কিশোরগঞ্জে তিনজন এবং কুমিল্লায় তিনজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
রাজধানীজুড়ে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ
৪ আগস্ট রাজধানীর শাহবাগ, সায়েন্সল্যাব, যাত্রাবাড়ী, মহাখালী, ধানমন্ডি-২৭, মিরপুর-১০, উত্তরা, রামপুরা ও বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। আন্দোলনে শিক্ষার্থী ছাড়াও অভিভাবক, শিক্ষক, দিনমজুর, সমাজকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, সায়েন্সল্যাব, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী ও মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সরকারদলীয় সমর্থক ও পুলিশের ত্রিমুখী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
শাহবাগ এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। একপর্যায়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ভবনে আশ্রয় নেন। এ সময় হাসপাতাল প্রাঙ্গণে অন্তত ২৪টি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়।
মিরপুর-১০ বিক্ষোভের অন্যতম কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। সেখানে পুলিশ ও অস্ত্রধারী আওয়ামী লীগ কর্মীদের অবস্থানের খবর পাওয়া যায়। গুলির শব্দে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
কারফিউ জারি, বন্ধ করা হয় মোবাইল ইন্টারনেট
দেশজুড়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়ি এবং দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার দেশব্যাপী কারফিউ জারি করে এবং ফোর-জি মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঘোষণায় বলা হয়, রাজধানী, বিভাগীয় শহর, জেলা সদর, উপজেলা সদর, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও শিল্পাঞ্চলে সন্ধ্যা ৬টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ কার্যকর থাকবে। একই সঙ্গে ৫ আগস্ট থেকে তিন দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়।
তবে কারফিউ জারির পরও চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, মুন্সিগঞ্জ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, ফেনী, রংপুর, ময়মনসিংহ, জয়পুরহাট ও ভোলাসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন অব্যাহত থাকে।
এর আগে ১৯ জুলাই মধ্যরাতে সরকার প্রথম অনির্দিষ্টকালের কারফিউ জারি করেছিল। পরে বিভিন্ন সময় তা শিথিল করা হয়।
টিআইবির নিন্দা, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাব
৪ আগস্ট এক বিবৃতিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘অবৈধ প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের’ নিন্দা জানায়।
সংস্থাটি দাবি করে, একটি শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলনকে পরিকল্পিতভাবে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় যারা নিপীড়নের নির্দেশ ও অনুমোদন দিয়েছেন, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়।
এদিকে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের একটি প্রস্তাব তুলে ধরে। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রস্তাবটি উপস্থাপন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
প্রস্তাবে বলা হয়, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্য নির্বাচনে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবে।
একই দিনে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে করা একটি রিট আবেদন খারিজ করেন হাইকোর্ট। আদালত বলেন, দায়িত্ব পালনের সময় প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বল প্রয়োগ করতে পারে।
আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় ৪ আগস্ট
১৬ জুলাই থেকে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর ৪ আগস্ট ছিল সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিনগুলোর একটি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, ১৬ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত সহিংসতায় অন্তত ৩১১ জন নিহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
৪ আগস্টের ব্যাপক প্রাণহানি এবং দেশজুড়ে চলমান সংঘর্ষের মধ্যেই ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি এক দিন এগিয়ে ৫ আগস্ট নির্ধারণ করা হয়। পরদিনের সেই কর্মসূচি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে।

