বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
Logo

সংবিধান থেকে বাদ যেতে পারে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘জাতির পিতা’ স্বীকৃতি

নিউজ ডেস্ক

সংবিধানে প্রথমবারের মতো বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদান এবং চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

একই সঙ্গে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত হওয়া শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে স্বীকৃতি, তার ৭ মার্চের ভাষণ এবং ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা-সংক্রান্ত বিধান বাদ দেওয়ার প্রস্তাবও সামনে এসেছে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতাও বাতিল হতে পারে।

সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠককে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

প্রস্তাবিত সংশোধনীর মধ্যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান পুনর্বহালের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের অবদান সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেতে পারে।

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সদস্যদের পরিচিতির পাশাপাশি সংবিধানের কোন কোন অংশে সংশোধনী আনা হবে, তা নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, উচ্চ আদালতের রায় এবং জুলাই সনদকে সামনে রেখে কমিটির সদস্যরা একাধিক প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন।

আলোচনায় দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ চালু, একজন ব্যক্তির টানা দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী না থাকা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, একাধিক ডেপুটি স্পিকারের পদ সৃষ্টি এবং সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর মতো বিষয়ও রয়েছে।

এ ছাড়া নৈতিক অপরাধে অভিযুক্ত কোনো সংসদ সদস্যের সদস্যপদ বাতিলের বিষয়ে নতুন বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি বিধান বাদ দেওয়ার প্রস্তাব

উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে সংবিধানের প্রথম ভাগের ৪(ক), ৭(ক)-এর বিভিন্ন উপধারা, ৭(খ) এবং ৪৪(২) অনুচ্ছেদ বাদ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে।

সংবিধানের ৪(ক) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও প্রধান বিচারপতির কার্যালয়সহ সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাস ও মিশনে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত হওয়া এ বিধানটি বাতিল করা হতে পারে। তবে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের প্রচলিত বিধান বহাল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাদ যেতে পারে দুটি তফসিল

পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত পঞ্চম ও ষষ্ঠ তফসিলও বাদ দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে।

বর্তমানে পঞ্চম তফসিলে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ এবং ষষ্ঠ তফসিলে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

অন্যদিকে, ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার কর্তৃক দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণাসংক্রান্ত সপ্তম তফসিল বহাল থাকবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।

‘বাঙালি’র পরিবর্তে ‘বাংলাদেশি’ জাতীয়তাবাদ

সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে থাকা জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়েও পরিবর্তন আনার প্রস্তাব উঠেছে।

সংবিধানের ৯ অনুচ্ছেদে থাকা ‘বাঙালি জাতির ঐক্য ও সংহতি বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি’—এ বক্তব্যে পরিবর্তন এনে ‘বাঙালি’র পরিবর্তে ‘বাংলাদেশি’ শব্দ যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।

ফিরতে পারে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট

উচ্চ আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের বিষয়টি সংবিধান সংশোধনের আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।

পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল। পরে উচ্চ আদালত ওই সংশোধনীর সংশ্লিষ্ট কয়েকটি বিধানকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে বিবেচনা করে বাতিল ঘোষণা করেন।

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের ফলে নির্বাচনব্যবস্থা দলীয়করণের অভিযোগ তৈরি হয় এবং নাগরিকদের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার প্রশ্ন ওঠে।

একই সঙ্গে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল হওয়া গণভোটের বিধান পুনর্বহালের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

বিশেষ কমিটির গঠন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন শেষ হওয়ার দুই দিন আগে, গত ১৩ জুলাই সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে সংবিধান সংশোধনের জন্য ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়।

প্রথমে ১৭ সদস্যের কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে সদস্যদের নাম না আসায় ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।

বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি পদ শূন্য রাখা হয়েছে। তবে এখনো জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস কমিটিতে কোনো সদস্যের নাম দেয়নি।

সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাবগুলো এখনো আলোচনাধীন। কমিটির পরবর্তী বৈঠক, রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত এবং সংসদীয় প্রক্রিয়া শেষে সংশোধনীর চূড়ান্ত রূপ নির্ধারিত হবে।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন