বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
Logo

গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক জনগণ: প্রধানমন্ত্রী

নিউজ ডেস্ক

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা রাজনৈতিক দলের অর্জন নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, এই অভ্যুত্থানের প্রকৃত মহানায়ক দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ।

বুধবার (৫ আগস্ট) সকালে রাজধানীতে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস উপস্থিত ছিলেন।

জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন গ্যালারি ও প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন। এ সময় তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি, শহীদদের আত্মত্যাগ, গণআন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার নির্যাতনের বিভিন্ন আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, নিদর্শন ও তথ্য পরিদর্শন করেন। পরে তিনি ‘জুলাই ৩৬’ শীর্ষক আলোচনা সভায় অংশ নেন।

আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা দলের নয়। এই অভ্যুত্থানের মহানায়ক দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ।’

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের তাৎপর্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল দেশের স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম, আর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার আন্দোলন।

তিনি বলেন, জনগণ যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ভুলে যায়নি, তেমনি ২০২৪ সালে দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষায় যারা শহীদ হয়েছেন, তাদেরও কখনো ভুলবে না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষ গুম ও অপহরণের শিকার হয়েছেন। লাখ লাখ মানুষ নির্যাতন, নিপীড়ন, হামলা ও মিথ্যা মামলার কারণে বছরের পর বছর ঘরছাড়া ছিলেন।

তিনি বলেন, শুধু জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেই হাজারো ছাত্র-জনতা, নারী ও শিশু নিহত হন এবং অন্তত ৩০ হাজার মানুষ আহত হন। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সব শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি হতাহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন।

জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান দমনে হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোর অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্রকামী মানুষকে দমন করতে ফ্যাসিস্ট চক্র চরম নৃশংসতার আশ্রয় নিয়েছিল। তার মতে, এমন বর্বরতা ও সহিংসতা সভ্য সমাজে বিরল।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তাদের পূর্বসূরিদের সাহস, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস তুলে ধরবে। একই সঙ্গে গণতন্ত্রবিরোধী শাসনের বিভিন্ন দিকও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে উন্মোচিত হবে।

তিনি বলেন, জাদুঘরটি শুধু ২০২৪ সালের নৃশংস ঘটনার স্মারক হয়ে থাকবে না; বরং বাংলাদেশের দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগ্রামের সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্পর্কও তুলে ধরবে। দেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসও এখানে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।

ইতিহাস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সত্যতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অসম্পূর্ণ, অতিরঞ্জিত কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান ইতিহাসের বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল করতে পারে এবং ভবিষ্যতে বিভেদের কারণ হতে পারে। তাই প্রতিটি তথ্য ও ঘটনার যথাসম্ভব সত্যতা যাচাই করে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

তিনি জাদুঘরের বিভিন্ন উপস্থাপনা বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষায় রাখার আহ্বান জানান, যাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও জনগণের আত্মত্যাগের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হতাহতদের প্রতিটি ঘটনার বিচার পর্যায়ক্রমে করা হবে। আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিচার স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

তিনি জানান, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদদের নামে তাদের নিজ নিজ এলাকায় সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সড়কের নামকরণ করা হবে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের চিকিৎসা সহায়তার বিষয়েও বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আহত জুলাইযোদ্ধাদের সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। গুরুতর আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে ৫০ জন জুলাইযোদ্ধা বিদেশে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এ ছাড়া গেজেটভুক্ত ১৩ হাজারের বেশি জুলাইযোদ্ধাকে শ্রেণিভিত্তিক মাসিক সম্মানী ভাতা দেওয়া হচ্ছে। তাদের নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে সরাসরি এই অর্থ পাঠানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি শহীদদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কাজও শুরু হয়েছে। দেশ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ৩১ দফা নির্বাচনি ইশতেহারের পাশাপাশি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, স্বনির্ভর, সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শহীদদের স্বপ্নের দেশ গড়ে তোলা হবে।

দেশে অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে কেউ কেউ অপ্রয়োজনীয় ইস্যু তৈরি করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ড পতিত স্বৈরাচারের পুনরুত্থানের সুযোগ তৈরি করছে কি না, তা ভেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর জন্য দেশের সেনাবাহিনীকে অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে জাদুঘর প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত স্থপতি, ইতিহাসবিদ, গবেষক, জাদুঘর বিশেষজ্ঞ, শিল্পী, সংগ্রাহক, কারিগর, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান।

শহীদদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘এই বাংলাদেশ আর কখনোই তাবেদারি রাষ্ট্রে পরিণত হবে না।’

পরে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন