বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
Logo

জুলাই সনদ ও ইশতেহারের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন

নিউজ ডেস্ক

জুলাই জাতীয় সনদ ও বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে থাকা অঙ্গীকারের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সংবিধান সংশোধন–সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। এ লক্ষ্যে জুলাই যোদ্ধা, জুলাই আন্দোলনে নিহতদের পরিবারের সদস্য, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, শিক্ষক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, শিক্ষার্থী প্রতিনিধি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামত নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বিশেষ কমিটির বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সংবিধান সংশোধন বিষয়ে মতামত দিতে আগ্রহ প্রকাশ করলেও তাদের প্রস্তাব বিবেচনা করা হবে।

মঙ্গলবার সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে কোনো আনুষ্ঠানিক কার্যপত্র উপস্থাপন করা হয়নি। তবে কমিটির সদস্যদের সংবিধান ও জাতীয় জুলাই সনদের কপি দেওয়া হয়।

সূত্র জানায়, প্রথম বৈঠকে সংবিধানের কোনো নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ নিয়ে আলোচনা হয়নি। বরং সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে কার কার সঙ্গে, কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় আলোচনা করা হবে—সেই কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। তবে অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময়সূচি এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।

বৈঠকে কমিটির সদস্যদের সংবিধান সংশোধন–সংক্রান্ত বিষয়গুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, জয়নুল আবেদীন, মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, আন্দালিভ রহমান পার্থ, মো. নুরুল হক, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমীন পুতুল, সাকিলা ফারজানা ও মো. মাহমুদুল হক রুবেল উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া সংসদ সচিবালয়ের সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া, আইন ও বিচার বিভাগের সচিব, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিব এবং আইন মন্ত্রণালয় ও জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে সব পক্ষের মতামত নেওয়া হবে। প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। পরে কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনী বিল জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হবে।

তিনি বলেন, সংসদে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে এমন সংশোধনী গ্রহণ করা হবে, যা জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কার আমরা করতে চাই। আমাদের যে প্রতিশ্রুতি ছিল, সেগুলো আমরা এখানে ধারণ করব।’

তবে কত দিনের মধ্যে কমিটির প্রতিবেদন চূড়ান্ত হবে, সে বিষয়ে এখনই কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি তিনি।

বিরোধী দলের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিরোধী দল কমিটিতে সদস্যের নাম না দিলেও তারা বৈঠকে উপস্থিত হয়ে অথবা বৈঠকের বাইরে লিখিতভাবে কোনো প্রস্তাব দিলে তা গ্রহণ করা হবে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিরোধী দল পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরবর্তী সময়ে কমিটিতে তাদের প্রতিনিধি মনোনয়ন দেবে।

জুলাই জাতীয় সনদের পাশাপাশি বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে থাকা সংবিধান সংস্কার–সংক্রান্ত অঙ্গীকারও পর্যালোচনা করা হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, জুলাই সনদে যেসব বিষয় প্রতিফলিত হয়নি, কিন্তু নির্বাচনি ইশতেহারে সংবিধান সংশোধনের অঙ্গীকার হিসেবে রয়েছে, সেগুলোও আলোচনা করে বিবেচনায় নেওয়া হবে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শহীদদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে। শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

বৈঠক শেষে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে পুরো সংবিধান পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কারণ, সংশোধনের সময় সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদের মধ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যাখ্যা ও পারস্পরিক সংযোগ বজায় রাখতে হবে।

তিনি বলেন, শুধু আবেগ, রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা কোনো নির্দিষ্ট মত চাপিয়ে দিয়ে সংবিধান সংশোধন করা হবে না। জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সব বিষয় পর্যালোচনা করা হবে।

বিরোধী দলের অংশগ্রহণ না থাকলে সংশোধনের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে ৩৩টি রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করেছে এবং সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তিনি বলেন, জুলাই সনদ সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে। কমিটি যদি সনদের অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত হয়, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলো সমালোচনা করার অধিকার রাখবে এবং যৌক্তিক সমালোচনা সমন্বয়ের চেষ্টা করা হবে।

চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সংসদের অনেক সদস্য প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে তাদের বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবনের জন্য কিছু সময় প্রয়োজন হতে পারে।

তিনি বলেন, বিরোধী দলের জন্য কমিটির দরজা খোলা রয়েছে। তারা যখনই প্রতিনিধি মনোনয়ন দেবে, তখনই তাদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ তুলে চিফ হুইপ বলেন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। তাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কারের বিকল্প নেই।

এদিকে সংবিধান সংশোধন–সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠকে বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর অংশগ্রহণ না থাকার বিষয়ে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সংবিধান সংশোধন একটি নিয়মিত সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হলেও অতীতে কয়েকটি সংশোধনী আদালতে বাতিল হয়েছে।

তার মতে, মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো সংশোধনী ভবিষ্যতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। এ কারণে কেবল সংশোধনের পরিবর্তে টেকসই সাংবিধানিক সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি বলেন, জনগণের ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে মৌলিক সংস্কার করা গেলে তা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বা আইনি প্রক্রিয়ায় সহজে পরিবর্তন কিংবা বাতিল হওয়ার ঝুঁকি কমবে।

তার ভাষ্য, জুলাইয়ের চেতনা ও গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সাংবিধানিক সংস্কারের পথেই এগোনো প্রয়োজন।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন