বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
Logo

ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য

নিউজ ডেস্ক

ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সংঘটিত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য উপায়ে করা হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

তিনি বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রতিটি অপরাধের বিচার হওয়া অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে বিগত ১৭ বছর ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ এবং গুম-খুনের শিকার ব্যক্তিদের নামে নিজ নিজ এলাকায় কোনো না কোনো প্রতিষ্ঠান নামকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

বুধবার (৫ আগস্ট) সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর ‘জুলাই ৩৬’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ প্রত্যাশা করে, এই জাদুঘর কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দলের একক বয়ান প্রতিষ্ঠার স্থান হবে না।

তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা দলের নয়। এই অভ্যুত্থানের মহানায়ক বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ।’

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের তাৎপর্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের। আর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার। একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের মানুষ যেমন ভুলে যায়নি, একইভাবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের শহীদদেরও জনগণ কখনো ভুলবে না।’

দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টার বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে কেউ কেউ অহেতুক ইস্যু তৈরি করে অস্থিরতা সৃষ্টি করছেন। এতে তারা নিজেদের অজান্তেই পতিত ও পলাতক স্বৈরাচারের পুনরুত্থানের পথ সুগম করছেন কি না, তা ভেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি।

দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলের বিভিন্ন ঘটনার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষ গুম ও অপহরণের শিকার হয়েছেন। লাখ লাখ মানুষ নির্যাতন, নিপীড়ন, হামলা ও মিথ্যা মামলার কারণে বছরের পর বছর ঘরবাড়ি ছাড়া ছিলেন।

তিনি বলেন, ‘শুধু জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেই হাজারো ছাত্র-জনতা, নারী ও শিশু শহীদ হয়েছেন। গণঅভ্যুত্থান ঠেকাতে ফ্যাসিস্ট চক্র হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়েও গণতন্ত্রকামী মানুষকে হত্যা করেছিল।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তাদের পূর্বসূরিদের সাহস, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস তুলে ধরবে। একই সঙ্গে জনগণের বেদনা, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও আন্দোলনের স্মৃতি জাতীয় ইতিহাসে স্থায়ীভাবে ধারণ করবে।

তিনি বলেন, এই জাদুঘর শুধু ২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহের স্মারক নয়; বাংলাদেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্পর্কও তুলে ধরবে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগ্রামের ইতিহাস সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

ইতিহাস সংরক্ষণে নিরপেক্ষতা ও সত্যতার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অসম্পূর্ণ, অতিরঞ্জিত কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান ইতিহাসকে শক্তিশালী করে না। বরং এতে ইতিহাসের বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল হয় এবং ভবিষ্যতে বিভেদের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, জাদুঘরের বিভিন্ন তথ্য ও উপস্থাপনা বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি এবং অন্যান্য ভাষায় রাখা হলে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবেন।

আহত জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি হাসপাতালে তাদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। গুরুতর আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক ও রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়েছে।

তিনি জানান, বর্তমানে ৫০ জন জুলাই যোদ্ধা বিদেশে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গেজেটভুক্ত ১৩ হাজারের বেশি জুলাই যোদ্ধাকে নিজ নিজ ব্যাংক হিসাবে শ্রেণিভিত্তিক মাসিক সম্মানী ভাতা দেওয়া হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি শহীদদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়তে সরকার রাষ্ট্র সংস্কার ও পুনর্গঠনের কাজও শুরু করেছে। দেশ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে বিএনপির ৩১ দফা ও নির্বাচনি ইশতেহারের পাশাপাশি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, গণভোটের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে গঠিত সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিও কাজ শুরু করেছে। একটি স্বনির্ভর, সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।

বক্তব্যের শেষে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সেনাবাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। শহীদ পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ আর কখনো কোনো তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হবে না।’

অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত যোদ্ধারা স্মৃতিচারণ করেন। পরে দেশাত্মবোধক গান, আবৃত্তি ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, দেশপ্রেম ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, বিভিন্ন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী, সরকারি কর্মকর্তা, কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতিজন, জুলাই যোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্য এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন