রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করলে কী হয়, কীভাবে এড়ানো যায়?

নিউজ ডেস্ক

মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয়। পানি, সামুদ্রিক খাবার, ফল, শাক-সবজি, লবণ, মধু, চা, চাল, মাংস—এমনকি আমরা যে বাতাসে শ্বাস নিই, সেখানেও ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় মানুষের রক্ত, ফুসফুস, প্ল্যাসেন্টা ও ধমনীতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

তবে মানবদেহে এসব কণার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কতটা গুরুতর, তা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। প্রাথমিক গবেষণার কিছু ফল সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত দিলেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের সঙ্গে নির্দিষ্ট রোগের সরাসরি সম্পর্ক নিশ্চিত করতে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মাইক্রোপ্লাস্টিক কী?

৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট, পলিথিন, বিভিন্ন প্যাকেজিং সামগ্রী ও সিন্থেটিক কাপড় সময়ের সঙ্গে ক্ষয়প্রাপ্ত ও ভেঙে ছোট ছোট কণায় পরিণত হলে মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরি হয়।

এর চেয়েও ক্ষুদ্র কণাকে ন্যানোপ্লাস্টিক বলা হয়। এগুলো খালি চোখে দেখা যায় না। আকার অত্যন্ত ছোট হওয়ায় ন্যানোপ্লাস্টিক শরীরের বিভিন্ন টিস্যু ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গে প্রবেশ করতে পারে—এমন সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে।

খাবারে মাইক্রোপ্লাস্টিক আসে যেভাবে

খাদ্যশৃঙ্খলের প্রায় প্রতিটি স্তরেই মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করতে পারে। দূষিত মাটি ও পানির মাধ্যমে উদ্ভিদ, মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর শরীরে এসব কণা পৌঁছাতে পারে। আবার খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং, পরিবহন ও সংরক্ষণের সময়ও প্লাস্টিক কণা খাবারের সঙ্গে মিশে যেতে পারে।

রান্না বা খাবার সংরক্ষণের সময় বাতাসে ভেসে থাকা প্লাস্টিকযুক্ত ধুলো খাবারের ওপর জমতে পারে। পাশাপাশি প্লাস্টিকের পাত্রে অতিরিক্ত গরম খাবার রাখা বা প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার গরম করার ক্ষেত্রেও ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা খাবারে চলে আসার আশঙ্কা থাকে।

মানবদেহে কী প্রভাব ফেলতে পারে?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তুলনামূলক বড় মাইক্রোপ্লাস্টিক কণার একটি অংশ পরিপাকতন্ত্রের মাধ্যমে শরীর থেকে বের হয়ে যেতে পারে। তবে অত্যন্ত ক্ষুদ্র কণা বা ন্যানোপ্লাস্টিক রক্ত ও বিভিন্ন টিস্যুতে প্রবেশ করতে পারে কি না এবং দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব কী—তা নিয়ে গবেষণা অব্যাহত রয়েছে।

গবেষণায় যেসব সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয় উঠে এসেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—

অক্সিডেটিভ স্ট্রেস: ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি করতে পারে। এর ফলে কোষ, প্রোটিন ও ডিএনএর ক্ষতির আশঙ্কা নিয়ে গবেষণা চলছে।

প্রদাহের ঝুঁকি: মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরের কিছু কোষে প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ বিভিন্ন রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও মানুষের ক্ষেত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সরাসরি ভূমিকা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।

রাসায়নিক দূষণ: কিছু প্লাস্টিকে ব্যবহৃত রাসায়নিক উপাদান বা পরিবেশ থেকে প্লাস্টিকের কণায় জমা হওয়া দূষক মানবদেহে প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্ত্রের জীবাণুর ভারসাম্য: প্রাথমিক কিছু গবেষণায় মাইক্রোপ্লাস্টিক অন্ত্রের উপকারী অণুজীবের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শ কমাবেন যেভাবে

পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় একে পুরোপুরি এড়িয়ে চলা কঠিন। তবে দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে এর সংস্পর্শ কমানো সম্ভব।

১. প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার গরম করবেন না
প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার রেখে মাইক্রোওয়েভে গরম করা এড়িয়ে চলুন। খাবার গরম করার জন্য কাঁচ বা সিরামিকের পাত্র ব্যবহার করা ভালো।

২. গরম পানীয় প্লাস্টিকের কাপে না খাওয়াই ভালো
অতিরিক্ত গরম চা বা কফি প্লাস্টিকের কাপে পান না করে কাঁচ, সিরামিক বা উপযোগী পুনর্ব্যবহারযোগ্য পাত্র ব্যবহার করতে পারেন।

৩. কাঁচ বা স্টেইনলেস স্টিলের পাত্র বেছে নিন
পানির বোতল, টিফিন বক্স ও খাবার সংরক্ষণের পাত্র হিসেবে কাঁচ বা স্টেইনলেস স্টিল ব্যবহার করলে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো যায়।

৪. নিরাপদ পানি ব্যবহার করুন
পানির উৎস ও মান বিবেচনা করে উপযুক্ত ফিল্টার ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সব ধরনের ফিল্টার সমানভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণ করতে পারে না।

৫. ফল ও সবজি ভালোভাবে ধুয়ে নিন
খাওয়ার আগে পরিষ্কার পানিতে ফল ও সবজি ভালোভাবে ধুয়ে নিলে এর ওপর জমে থাকা ধুলোবালি ও কিছু দূষক কমানো সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পেতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তবে অপ্রয়োজনীয় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক কমানো, গরম খাবারের ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের ব্যবহার এড়িয়ে চলা এবং নিরাপদ খাদ্য সংরক্ষণের অভ্যাস গড়ে তোলা ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ও পরিবেশ—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন