রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলা নিয়ে ন্যাটো জোটে উদ্বেগ

নিউজ ডেস্ক

ন্যাটো জোটের প্রতিরোধক্ষমতা ও ঐক্য পরীক্ষা করতে রাশিয়া আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জোটটির কোনো সদস্য দেশের বিরুদ্ধে সীমিত হামলা চালাতে পারে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। সম্ভাব্য হামলার ধরন হিসেবে পূর্ব ইউরোপে সীমিত স্থল অনুপ্রবেশ, সাইবার হামলা কিংবা বিভিন্ন ধরনের হাইব্রিড আক্রমণের কথা বলা হয়েছে।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, মার্কিন কর্মকর্তাদের নতুন মূল্যায়ন অনুযায়ী, চলতি শরৎকাল থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে রাশিয়া পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর কোনো সদস্যকে লক্ষ্য করে উত্তেজনা বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে।

আগের মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যস্ত থাকা অবস্থায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অন্য কোনো দেশে সরাসরি সামরিক অভিযান চালানোর ঝুঁকি নেবেন না। নতুন মূল্যায়ন সেই ধারণা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

কী ধরনের হামলার আশঙ্কা?

মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, সম্ভাব্য রুশ পদক্ষেপ সরাসরি বড় ধরনের সামরিক অভিযান দিয়ে শুরু নাও হতে পারে। বরং সাইবার হামলা, নাশকতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, পরিচয় গোপন রাখা সশস্ত্র গোষ্ঠীর মাধ্যমে সীমিত অনুপ্রবেশ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলার মতো কৌশল নেওয়া হতে পারে।

ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় সদস্যদের জন্য সীমিত স্থল অনুপ্রবেশকে তুলনামূলক কম সম্ভাব্য হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সময়ের সঙ্গে এ ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে গোয়েন্দা মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে।

কারণ, কোনো ন্যাটো সদস্য দেশের ওপর সরাসরি হামলা হলে জোটের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় বিষয়টি চলে আসতে পারে। ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, একটি সদস্য দেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র হামলাকে পুরো জোটের বিরুদ্ধে হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।

পোল্যান্ড ও বাল্টিক অঞ্চলে উদ্বেগ

রাশিয়ার সম্ভাব্য উসকানিমূলক তৎপরতা নিয়ে কয়েক মাস ধরেই সতর্ক করে আসছে পোল্যান্ড ও বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলো।

ইউরোপীয় ও মার্কিন গোয়েন্দাদের কিছু মূল্যায়নে পোল্যান্ডের ভূখণ্ডে সশস্ত্র উসকানি, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা এবং ইউক্রেনের ওপর দায় চাপানোর উদ্দেশ্যে সাজানো হামলার সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে।

লিথুয়ানিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্টাস কাউনাসও বাল্টিক অঞ্চলে সম্ভাব্য ‘সাজানো’ হামলা নিয়ে সতর্ক করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের প্রতি ইউরোপীয় সমর্থন দুর্বল করা এবং ন্যাটোর সদস্যদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করাই এ ধরনের কর্মকাণ্ডের অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে।

জার্মানিতে বিস্ফোরকবাহী ড্রোন ঘিরে তদন্ত

রাশিয়ার সম্ভাব্য নাশকতামূলক তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে জার্মানির লাইপজিগ/হ্যালে বিমানবন্দরের একটি ঘটনার পর।

সেখানে ইউক্রেনীয় একটি কার্গো বিমানের কাছে বিস্ফোরক বহনকারী একটি ড্রোন পাওয়ার পর জার্মান কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করেছে। ড্রোনটির উৎস এখনো নিশ্চিত না হলেও জার্মানির কয়েকজন রাজনীতিক এ ঘটনার পেছনে মস্কোর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছেন।

ঘটনার পর বিমানবন্দরটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিমানবন্দরটি জার্মান সামরিক বাহিনী ও ন্যাটো মিত্রদের সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে কোনো ঘটনায় রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এসব অভিযোগকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

যুক্তরাজ্যও সতর্ক

রাশিয়ার সম্ভাব্য হাইব্রিড তৎপরতা নিয়ে সতর্ক করেছে যুক্তরাজ্যও। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বলেছেন, যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যেসব উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের খবর সামনে আসছে, সেগুলো হয়তো আরও বড় ধরনের কর্মকাণ্ডের সামান্য অংশ।

তিনি ইংলিশ চ্যানেলে রুশ যুদ্ধজাহাজের লাইভ-ফায়ার মহড়ার প্রসঙ্গ তুলে এটিকে দায়িত্বজ্ঞানহীন ও উসকানিমূলক আচরণ হিসেবে বর্ণনা করেন।

সরাসরি যুদ্ধ নাকি ‘হাইব্রিড’ কৌশল?

বিশ্লেষকদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—রাশিয়া কি সত্যিই কোনো ন্যাটো সদস্য দেশে সরাসরি হামলা চালাবে, নাকি সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে হাইব্রিড যুদ্ধের পথ বেছে নেবে?

ন্যাটোর বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান রাশিয়ার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এতে যুক্তরাষ্ট্রসহ পুরো ন্যাটো জোটের সামরিক প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এ কারণে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, সাইবার হামলা, নাশকতা, বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা ও সীমিত গোপন অভিযান তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প হতে পারে।

ন্যাটোর মুখপাত্র কর্নেল মার্টিন ও’ডোনেল জানিয়েছেন, প্রয়োজন অনুযায়ী জোট প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তার বক্তব্যে স্পষ্ট, সম্ভাব্য হুমকিকে ন্যাটো হালকাভাবে দেখছে না।

ইউক্রেন যুদ্ধের নতুন মাত্রা?

মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে পরিবর্তনের পেছনে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়িত্বও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউক্রেনে দ্রুত জয় অর্জনে ব্যর্থতা এবং পশ্চিমা দেশগুলোর অব্যাহত সমর্থন মস্কোর কৌশলগত হিসাবকে বদলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

রাশিয়া যদি মনে করে ইউক্রেনকে পশ্চিমা সমর্থন দুর্বল করা সম্ভব, তাহলে ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলে সীমিত মাত্রার উসকানি বা হাইব্রিড হামলা চালিয়ে জোটের রাজনৈতিক ঐক্য পরীক্ষা করার চেষ্টা করতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন সামনে আসছে।

তবে গোয়েন্দা সতর্কতা মানেই হামলা নিশ্চিত নয়। বরং সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়াই এ ধরনের মূল্যায়নের অন্যতম উদ্দেশ্য।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ভুল হিসাব

রাশিয়া ও ন্যাটোর মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের সম্ভাবনার চেয়েও বড় উদ্বেগ তৈরি করছে ভুল হিসাবের ঝুঁকি। সীমান্তবর্তী এলাকায় কোনো ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র বা নাশকতার ঘটনা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হলে তা দ্রুত বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনায় রূপ নিতে পারে।

বিশেষ করে বাল্টিক অঞ্চল ও পোল্যান্ডের মতো ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় সদস্যরা ভৌগোলিকভাবে রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের কাছাকাছি হওয়ায় ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

ফলে আগামী কয়েক বছর ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে সামরিক শক্তির পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষা এবং গোয়েন্দা সহযোগিতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সব মিলিয়ে, রাশিয়ার ন্যাটোভুক্ত কোনো দেশে হামলার আশঙ্কা এখনো একটি সম্ভাব্য—নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর ধারাবাহিক সতর্কবার্তা ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এখন শুধু ইউক্রেনের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয়টি আর নিশ্চিত ধরে নেওয়া যাচ্ছে না।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন