বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
Logo

জুলাই তথ্যচিত্র নিয়ে বিতর্ক: অনুমোদন ছিল মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের

নিউজ ডেস্ক

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রদর্শিত বিতর্কিত তথ্যচিত্র নিয়ে সমালোচনা ও প্রশ্নের মুখে পড়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, তথ্যচিত্রটি চূড়ান্ত করার আগে মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ে একাধিকবার প্রদর্শন করা হয় এবং সেখানেই এর বিভিন্ন ছবি, ভিডিও ও তথ্য বাদ দেওয়া হয়েছিল।

সূত্রগুলো বলছে, তথ্যচিত্রটির অনুমোদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন ও সচিব মো. আশরাফুল ইসলাম যুক্ত ছিলেন। এমনকি তথ্যচিত্র তৈরির জন্য গঠিত কমিটিতেও মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরের কর্মকর্তাদের রাখা হয়েছিল।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ৮ জুলাই অতিরিক্ত সচিব মো. জিয়াউদ্দীন আহমেদকে আহ্বায়ক করে জুলাই আন্দোলনের তথ্যচিত্র প্রস্তুতের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি মন্ত্রীর একান্ত সচিব ও প্রতিমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিবকেও সদস্য করা হয়েছিল।

তথ্যচিত্রটির খসড়া মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে দুই দফায় প্রদর্শন করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রাথমিক সংস্করণে জুলাই আন্দোলনের শহীদ আবু সাঈদসহ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও দৃশ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তী পর্যায়ে মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশনায় কিছু ছবি ও ভিডিও বাদ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

এর ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র তথ্যচিত্রে প্রতিফলিত হয়নি- এমন অভিযোগ সামনে এসেছে।

৫ আগস্ট তথ্যচিত্রটি প্রকাশের পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক শুরু হয়। জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিভিন্ন পক্ষ তথ্যচিত্রটির বিষয়বস্তু নিয়ে আপত্তি তোলে। একপর্যায়ে রাজধানীতে আয়োজিত সরকারি অনুষ্ঠানে এ নিয়ে হট্টগোল ও বাগ্বিতণ্ডার ঘটনাও ঘটে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজন কূটনীতিকও পরিস্থিতির মধ্যে বেরিয়ে যান বলে জানা গেছে।

বিতর্কের পর বৃহস্পতিবার দিনভর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রী, সচিব এবং তথ্যচিত্র প্রস্তুত কমিটির সদস্যরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। একই সময়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তথ্যচিত্রটি নিয়ে ওঠা অভিযোগ পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় জানায়, প্রদর্শিত তথ্যচিত্রটির বিষয়ে উত্থাপিত অভিযোগ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় পরিমার্জন শেষে দ্রুততম সময়ে তা প্রকাশ করা হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস নির্ভুল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও তথ্যভিত্তিকভাবে সংরক্ষণে মন্ত্রণালয় অঙ্গীকারবদ্ধ বলেও জানানো হয়। একই সঙ্গে ঘটনাটির জন্য দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে।

তবে তথ্যচিত্র নিয়ে সমালোচনার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলেও মনে করছে মন্ত্রণালয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অভিযোগ জানানোর অধিকার সবার থাকলেও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি, বিদেশি কূটনীতিক, গণমাধ্যম ও আমন্ত্রিত অতিথিদের সামনে গোলযোগ সৃষ্টি করা পরিশীলিত ও নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

মন্ত্রণালয় আরও দাবি করেছে, ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, তার কিছু অংশ অপতথ্য। এ ধরনের প্রচারণা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

অন্যদিকে, সমালোচকদের প্রশ্ন—জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মতো একটি ঐতিহাসিক ঘটনার সরকারি তথ্যচিত্র তৈরির ক্ষেত্রে যদি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বা ভুক্তভোগীদের বাদ দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের দায় কার এবং কোন প্রক্রিয়ায় তা নেওয়া হয়েছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, কোনো গণআন্দোলনের রাষ্ট্রীয় দলিল বা তথ্যচিত্র রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে থেকে তৈরি করা জরুরি। কারণ, সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা পরিবর্তিত হলেও ঐতিহাসিক ঘটনার প্রামাণ্য নথি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে। ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের তথ্যচিত্র নিয়ে ওঠা বিতর্ক শুধু একটি ভিডিওর সম্পাদনা বা প্রদর্শনের প্রশ্ন নয়; বরং রাষ্ট্র কীভাবে সাম্প্রতিক ইতিহাস সংরক্ষণ করবে, সেটিও এর সঙ্গে যুক্ত।

এ অবস্থায় তথ্যচিত্রটি পুনর্মূল্যায়ন, বাদ পড়া উপাদানগুলোর বিষয়ে ব্যাখ্যা এবং পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে বিতর্ক অনেকটাই নিরসন হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন