গাজীপুরের কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে আবারও বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি শিল্পের গতি ফিরেছে বলে জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি বলেছেন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি গুগল, মেটা ও টিকটকের মতো আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও এখানে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে।
শনিবার (৮ আগস্ট) দেশের প্রথম হাই-টেক পার্ক কালিয়াকৈর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান মন্ত্রী। সরকারের ঘোষিত ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতি পর্যালোচনার অংশ হিসেবে তিনি পার্কটি পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শনকালে মন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং পার্কের কয়েকটি শিল্পকারখানা ঘুরে দেখেন। এ সময় প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বিকাশ, বিনিয়োগের পরিবেশ, অবকাঠামো এবং কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা ও বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়।
৮৫ প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ, উৎপাদনে ৪০
মন্ত্রী জানান, কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে এখন পর্যন্ত ৮৫টি প্রতিষ্ঠানকে জমি বা স্পেস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান। বরাদ্দ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪০টি ইতোমধ্যে উৎপাদন বা ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করেছে। আরও ২৮টি প্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজ চলছে এবং ১৭টি প্রতিষ্ঠান শিগগিরই নির্মাণ শুরু করবে।
পার্কে প্রস্তাবিত মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১৬৩ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ইতোমধ্যে প্রায় ২৮৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। পার্কের মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার এখন পর্যন্ত ৫০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে।
ব্যবসায়িক পরিবেশ ও ইকোসিস্টেম যথাযথভাবে গড়ে তোলা গেলে এই হাই-টেক পার্কে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলে জানান মন্ত্রী।
বিদেশি বিনিয়োগের বড় সম্ভাবনা
ফকির মাহবুব আনাম বলেন, চীন, জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাতটি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৬২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। এর ফলে কালিয়াকৈর ভবিষ্যতে শুধু দেশীয় প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনের কেন্দ্র নয়, বরং বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন, সংযোজন, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ হাব হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমানে পার্কে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ফাইবার অপটিক্যাল কেবল, এটিএম ও ক্যাশ রিসাইকেলার মেশিন, গাড়িসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদন হচ্ছে। পাশাপাশি রাউটার, সুইচ, সিসিটিভি, এসি, রেফ্রিজারেটর, হোম অ্যাপ্লায়েন্স, কিডনি ডায়ালাইসিস মেশিন ও বিভিন্ন ধরনের আইওটি ডিভাইসও তৈরি হচ্ছে।
দুটি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে ডেটা সেন্টার স্থাপনের কাজ করছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত এআই ডেটা সেন্টার প্রকল্পে গুগল, মেটা ও টিকটকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ আগ্রহের কথা জানিয়েছেন মন্ত্রী।
যেসব সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ
কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগ বাড়াতে কর ও শুল্ক সুবিধাসহ বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান ফকির মাহবুব আনাম।
মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক-কর সুবিধা, বিদ্যুৎ ও গ্যাসসহ প্রয়োজনীয় সেবায় ভ্যাট সুবিধা, হাই-টেক পণ্যের তালিকা সম্প্রসারণ এবং ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের পাশাপাশি অ্যাসেম্বলিং খাতকে সুবিধার আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া স্থানীয় বাজারে পণ্য বিপণনে কাঁচামালের শুল্ক-কর রেয়াত, স্থিতিশীল আয়কর সুবিধা এবং ইভি ব্যাটারি, সোলার ব্যাটারি, ইউপিএস ব্যাটারি ও ই-বাইকের মতো উদীয়মান প্রযুক্তি খাতের জন্য পৃথক প্রণোদনা কাঠামো তৈরির কাজ চলছে।
অবকাঠামো ও সেবায় নজর
পার্কটির সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। অসম্পূর্ণ অবকাঠামো দ্রুত শেষ করা, নিরাপত্তা ও সিসিটিভি মনিটরিং জোরদার, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে ডাবল লাইন সংযোগ, গ্যাসলাইন স্থাপন এবং প্রশাসনিক ও সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য কাস্টমস হাউস সেবা চালু, নিয়মিত রেল যোগাযোগ, জনবল সংকট দূর করা এবং বিদ্যমান নীতিমালা সংশোধনের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমেয় নীতিগত সুবিধার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগ আরও দ্রুত বাড়বে। এতে দেশে প্রযুক্তিপণ্যের উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমবে, রপ্তানি সম্প্রসারিত হবে এবং উচ্চ দক্ষতার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের ইকোসিস্টেম তৈরি, শিল্প-একাডেমিয়া-সরকারের মধ্যে সমন্বয় এবং বিনিয়োগকারীদের দ্রুত ওয়ান-স্টপ সেবা নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে দক্ষ মানবসম্পদ ও উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি প্রযুক্তি উৎপাদন ও রপ্তানি হাবে পরিণত করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
পরিদর্শনের সময় কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. ফজলুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে মন্ত্রী কালিয়াকৈরে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, বাংলাদেশের (ইউএফটিবি) একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেন।

