রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

ছবি থেকে গ্রেফতার: শাহজালাল বিমানবন্দরে এআইভিত্তিক নজরদারি

নিউজ ডেস্ক

শাহজালালসহ তিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ডিজিটাল নজরদারি | ফেসিয়াল রিকগনিশনে শনাক্ত হবে পলাতক আসামি | গোল্ড ডিটেকশনে ধরাও পড়বে লুকানো সোনা

গুরুতর অপরাধ করে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছেন? কিংবা বিদেশে পালিয়ে গিয়ে ফিরছেন ভিন্ন পরিচয়ে? বিমানবন্দরে প্রযুক্তির চোখ এড়ানো এখন কঠিন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে থাকা একটি ছবিই যথেষ্ট—সেই ছবি দিয়ে এআই প্রযুক্তি শনাক্ত করতে পারবে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে। বিমানবন্দরের ক্যামেরায় মুখের মিল পাওয়া গেলেই সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে যাবে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা।

শুধু পলাতক আসামি নয়, সোনা ও অবৈধ মালামাল চোরাচালান ঠেকাতেও ব্যবহার করা হচ্ছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপত্তা জোরদারে যুক্ত হয়েছে এআই-চালিত সিসিটিভি ক্যামেরা, ফেসিয়াল রিকগনিশন সিস্টেম এবং উচ্চ সংবেদনশীল ‘গোল্ড ডিটেকশন’ প্রযুক্তি।

এক ছবি থেকেই শুরু শনাক্তকরণ

সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সূত্র জানায়, দেশের যেকোনও প্রান্তে অপরাধ করে কোনও ব্যক্তি পাসপোর্ট ছাড়া কিংবা ভিন্ন পরিচয় ব্যবহার করে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করলে তার একটি ছবি বিমানবন্দরের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে দেওয়া যাবে। এরপর সেই ছবি ধরে কাজ শুরু করবে ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি।

বিমানবন্দরের অ্যারাইভাল ও ডিপার্চার টার্মিনাল, বোর্ডিং ব্রিজ, ইমিগ্রেশন কাউন্টার ও কার্গো ভিলেজের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় বসানো হয়েছে উচ্চপ্রযুক্তির এআই ক্যামেরা।

ক্যামেরায় ধারণ করা মুখমণ্ডলের সঙ্গে সংরক্ষিত ছবির মিল পাওয়া গেলে সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের কাছে ‘অ্যালার্ট’ পাঠাবে। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে।

সন্দেহজনক আচরণেও সতর্ক করবে এআই

প্রযুক্তিটির ব্যবহার শুধু পলাতক আসামি শনাক্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিমানবন্দরে কোনও ব্যক্তি দীর্ঘসময় অস্বাভাবিক আচরণ করলে কিংবা কোনও পরিত্যক্ত বস্তু পড়ে থাকলেও এআই সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্ক সংকেত দিতে পারে।

নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানুষের নজরদারির সঙ্গে প্রযুক্তির সমন্বয় বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা বাড়িয়েছে।

শরীরের ভেতরে লুকানো সোনাও নজরদারিতে

সোনা চোরাচালানে পাচারকারীরা প্রতিনিয়ত নতুন কৌশল ব্যবহার করছে। কখনও তরল বা পেস্ট আকারে, আবার কখনও শরীরের বিশেষ অংশে লুকিয়ে সোনা পাচারের চেষ্টা করা হচ্ছে।

এসব কৌশল ঠেকাতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ব্যবহার করা হচ্ছে আধুনিক ‘গোল্ড ডিটেকশন’ প্রযুক্তি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, উচ্চ সংবেদনশীল এই প্রযুক্তির মাধ্যমে জামাকাপড় কিংবা শরীরের ভেতরে লুকিয়ে রাখা ক্ষুদ্র ধাতব বস্তু ও সোনা শনাক্ত করা সম্ভব।

ফলে চোরাচালান ঠেকানোর পাশাপাশি সাধারণ যাত্রীদের অপ্রয়োজনীয় তল্লাশি ও হয়রানি কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিজস্ব অর্থায়নে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমোডর আসিফ ইকবাল বলেন, “বিমানবন্দরে যেসব সরকারি সংস্থা কাজ করে, তারা নিজস্ব অর্থায়নে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি কিনে ব্যবহার করছে। এর পাশাপাশি বেবিচকের নিজস্ব ‘এভসেক’ সিকিউরিটিও সতর্ক রয়েছে।”

তিনি বলেন, “টেকনিক্যাল ইকুইপমেন্ট ব্যবহারের ফলে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে গত দু-আড়াই বছরে আমরা ঈর্ষণীয় সাফল্য পেয়েছি।”

সার্বক্ষণিক নজরদারিতে শাহজালাল

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদ বলেন, অপরাধী ও চোরাকারবারীদের ধরতে বিমানবন্দরে নিয়োজিত সংস্থাগুলো হাই-টেক সরঞ্জাম দিয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মান ও আধুনিক সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাতেও প্রযুক্তির পরামর্শ

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ রাসেল সরকার বলেন, বর্তমান সময়ে অপরাধীরাও প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতন। তাই বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় এ ধরনের ডিজিটাল নজরদারি প্রশংসনীয়।

দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর স্থাপনাতেও এ ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এআই, ফেসিয়াল রিকগনিশন ও আধুনিক ডিটেকশন প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহারে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। পলাতক অপরাধী শনাক্তের পাশাপাশি চোরাচালান প্রতিরোধ এবং সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারেও এসব প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন