বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ফেরত নেওয়ার কথা জানিয়েছে দেশটির সামরিক সরকার। তবে প্রত্যাবাসন শুরুর আগে রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হতে হবে বলে শর্ত দিয়েছে নেপিদো।
শনিবার (১৫ আগস্ট) মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, বাংলাদেশ থেকে পাঠানো রোহিঙ্গাদের তালিকা যাচাই করে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ মোট ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমারের কাছে পাঠিয়েছে। এর মধ্যে জুলাইয়ের শেষ নাগাদ ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। যাচাই করা তালিকার মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনের পরিচয় মিয়ানমারের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে নিশ্চিত হয়েছে।
অন্যদিকে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। আরও ৪ হাজার ২৪১ জনের বিরুদ্ধে তথাকথিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে বলে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
প্রত্যাবাসনে নিরাপত্তা শর্ত
রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার ঘোষণা দিলেও মিয়ানমার জানিয়েছে, রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব নয়। বর্তমানে রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘাত চলছে।
২০২৩ সাল থেকে এই সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছে। আরাকান আর্মি রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ায় অঞ্চলটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে নতুন করে অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছে।
২০১৭ সালের পর সংকট
২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানের পর সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মিলিয়ে বর্তমানে কক্সবাজার ও আশপাশের শিবিরগুলোতে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে।
ওই সামরিক অভিযানকে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও দেশ জাতিগত নিধন এবং গণহত্যার অভিযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছে। তবে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে এবং তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করে থাকে।
মিয়ানমারের দাবি, ২০১৭ সালের সংঘাতের সময় বাংলাদেশে ৫ লাখ ৪০ হাজার মানুষ পালিয়ে যায়। একই সময়ে দুই লাখের বেশি মানুষ উত্তর রাখাইনে থেকে যায় বলেও দাবি করেছে দেশটি।
২০১৮ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দুই বছরের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্পন্ন করার লক্ষ্যে চুক্তি করেছিল। তবে নানা কারণে সেই উদ্যোগ বাস্তবে কার্যকর হয়নি। ২০২১ সালে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা নেওয়ার পর দেশটির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
শিবিরে বাড়ছে চাপ
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করা রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক ত্রাণ ও অর্থসহায়তার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে শরণার্থী শিবিরগুলোতে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণে চাপ বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌপথে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করছেন হাজার হাজার রোহিঙ্গা।
সম্প্রতি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম দাবি করেন, দেশটিতে অবস্থানরত ৫ হাজার রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে। তবে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হান উইন অং পরে জানান, মালয়েশিয়ার আটককেন্দ্রে থাকা যাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে যাচাই করা সম্ভব হয়েছে, কেবল তাদেরই ফেরত নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। সাধারণভাবে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।
ফলে মিয়ানমারের নতুন ঘোষণায় প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা তৈরি হলেও রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, রোহিঙ্গাদের পরিচয় ও নাগরিকত্বের স্বীকৃতি এবং প্রত্যাবাসনের পরিবেশ নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনও রয়ে গেছে।

