নিউজ ডেস্ক
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন নিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, নতুন কমিটির একটি খসড়া বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে রয়েছে। তার অনুমোদন পাওয়ার পর যেকোনো সময় নতুন কমিটি ঘোষণা হতে পারে।
তবে ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনের বিষয়ে এখনো দলীয়ভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পাননি বলে জানিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। গত শুক্রবার তিনি জানান, এ বিষয়ে তার কাছে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আসেনি।
এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে ছাত্রদলের বর্তমান শীর্ষ পাঁচ নেতার বিদায়ী সাক্ষাৎ নতুন কমিটি ঘোষণার আলোচনা আরও জোরালো করেছে। সাক্ষাতের পর সংগঠনটির বর্তমান সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন বিদায়ী বার্তা দেন।
দলীয় সূত্রের ভাষ্য, বিদায়ী সাক্ষাতে সাম্প্রতিক আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রদলের ভূমিকা, সংগঠনের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, নতুন প্রজন্মকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা এবং বিদায়ী নেতাদের বিএনপির মূল রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
সূত্রগুলো বলছে, গত কয়েক বছরের সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ছাত্রদলের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা নেতাদের পরবর্তী ধাপে নিয়ে গিয়ে নতুনদের নেতৃত্বের সুযোগ দেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দুই বছরের মেয়াদ শেষ, নতুন নেতৃত্বের অপেক্ষা
২০২৪ সালের ১ মার্চ রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি ও নাছির উদ্দীন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। পরে ১৫ জুন ২৬০ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়।
সংগঠনটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সংসদের মেয়াদ দুই বছর। সেই হিসাবে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এরপর থেকেই নতুন কমিটির শীর্ষ পদে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রদলের ভূমিকা এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সংগঠনটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্বাচনকে বিএনপির সাংগঠনিক পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় একাধিক নাম
নতুন কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে একাধিক নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকায় কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি ইজাজুল কবির রুয়েল, সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান, প্রথম যুগ্ম সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান, যুগ্ম সম্পাদক ইব্রাহিম খলিল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবিদুল ইসলাম খানের নাম রয়েছে।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় সহসভাপতি কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিক, যুগ্ম সম্পাদক রিয়াদ রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আরিফুল ইসলাম আরিফ, খোরশেদ আলম সোহেল, যুগ্ম সম্পাদক তরিকুল ইসলাম তারিক, মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স, রাজু আহমেদ, গাজী সাদ্দাম হোসেন, প্রচার সম্পাদক শরীফ প্রধান শুভ, মোস্তাফিজুর রহমান শুভ, সাফি ইসলাম ও নুর আলম ভূঁইয়া ইমনের নামও বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে।
তবে শেষ পর্যন্ত কারা শীর্ষ দুই পদে আসছেন, তা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে।
কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি ইজাজুল কবির রুয়েল বলেন, নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে গেছে এবং যেকোনো সময় ঘোষণা আসতে পারে। হাইকমান্ড যে সিদ্ধান্তই নেবে, তা মেনে নেওয়ার কথা জানান তিনি।
অন্যদিকে রিয়াদ রহমান বলেন, ভবিষ্যৎ ছাত্র নেতৃত্বকে নৈতিক, শিক্ষার্থীবান্ধব ও গ্রহণযোগ্য হতে হবে। শিক্ষার্থীদের অধিকার, নিরাপত্তা ও কল্যাণে কাজ করাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।
মমিনুল ইসলাম জিসানও জানান, সহযোদ্ধাদের একটি অংশ তাকে নেতৃত্বে দেখতে চায়। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের—এ বিষয়ে তিনি আস্থাশীল।
বিদায়ী রাকিব-নাছিরের আবেগঘন বার্তা
নতুন কমিটি গঠনের আলোচনা যখন তুঙ্গে, তখন বর্তমান সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের বিদায়ী বার্তা নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে।
তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে রাকিব দায়িত্ব পালনের সময়কার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে ক্ষমা চেয়ে তিনি নতুন রাজনৈতিক জীবনের জন্য সবার দোয়া ও শুভকামনা কামনা করেন।
এরপর বিদায়ী বার্তা দেন সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরও। দায়িত্ব পালনের সময় কোনো ভুল বা অন্যায় হয়ে থাকলে ক্ষমা চেয়ে তিনি জানান, পদ থেকে বিদায় নিলেও ছাত্রদলের আদর্শ ও সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়া সম্ভব নয়।
নতুন নেতৃত্বের অধীনে ছাত্রদল আরও শক্তিশালী, সংগঠিত ও গতিশীল হবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।
নতুন নেতৃত্বে কী প্রত্যাশা?
ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
নেতাকর্মীদের একটি অংশ মনে করছে, অতীতের আন্দোলনে পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাদের মধ্য থেকে নেতৃত্ব বাছাই করা হলে সংগঠনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। অন্যদিকে আরেকটি অংশ চায়, ছাত্রদলকে শুধু রাজনৈতিক আন্দোলনকেন্দ্রিক সংগঠন না রেখে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, অধিকার, নিরাপত্তা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কল্যাণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার উপযোগী করে গড়ে তোলা হোক।
সবমিলিয়ে বর্তমান কমিটির বিদায়ী সাক্ষাৎ ও নেতাদের ধারাবাহিক বার্তার পর ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব নিয়ে অপেক্ষা আরও বেড়েছে। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে কারা আসছেন, তা নিশ্চিত নয়। শেষ পর্যন্ত বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে ছাত্রদলের আগামী দিনের নেতৃত্ব।

