২০২৩ সালেই ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সরকার গঠনের তৎপরতা চলছে বলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম।
সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টির ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, ২০২৩ সালের মার্চে একটি প্রতিবেদনে সম্ভাব্য একটি জাতীয় সরকার গঠনের রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন তিনি। সেখানে সম্ভাব্য কয়েকজনের নামও উল্লেখ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ওই তালিকায় থাকা অনেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা কিংবা বিভিন্ন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
মনিরুল ইসলাম বলেন, ২০২৩ সালের মার্চে তৈরি করা ওই প্রতিবেদনের একটি কপি পরে তিনি উদ্ধার করেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে সেটি পর্যালোচনা করে দেখেন, প্রতিবেদনের প্রায় ৯০ শতাংশ তথ্য পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে মিলে গেছে বলে তার মনে হয়েছে।
তিনি জানান, ওই প্রতিবেদন সরাসরি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন এবং শেখ হাসিনা সেটি পড়ে দেখেছিলেন। প্রতিবেদনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সম্ভাব্য জাতীয় সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার বিষয়টি উল্লেখ ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, প্রতিবেদনে ধারণা করা হয়েছিল, বয়সজনিত কারণে ড. ইউনূস নিজে সরকারপ্রধান নাও হতে পারেন এবং তার প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে কাউকে জাতীয় সরকারের নেতৃত্বে আনা হতে পারে। তবে শেখ হাসিনা তাকে বলেছিলেন, ইউনূস নিজেই ক্ষমতায় থাকতে চাইবেন।
মনিরুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ওই প্রতিবেদনের বেশিরভাগ বিষয়কে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলেন। সেখানে ২০২৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল হওয়ার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
সাবেক এসবি প্রধান আরও বলেন, পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপি-জামায়াতের সমাবেশকে ঘিরে একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা হয়েছিল বলে তারা মনে করেছিলেন। ওই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসায় পরিকল্পনাটি তখন বাস্তবায়িত হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য, নির্বাচনের পর সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে এক ধরনের আত্মতুষ্টি তৈরি হয়েছিল। ফলে পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অনেকেই গুরুত্ব দিয়ে দেখেননি।
সাক্ষাৎকারে মনিরুল ইসলাম বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কথিত ‘ডিপ স্টেট’-এর ভূমিকা নিয়েও বিস্তর দাবি করেন। তিনি বলেন, প্রচলিত রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন সম্ভব নয়—এমন ধারণা থেকে ছাত্র ও তরুণদের আন্দোলনে কাজে লাগানোর কৌশল নেওয়া হয়েছিল বলে তিনি মনে করেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের কথা উল্লেখ করেন। তার দাবি, এসব আন্দোলনকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও কৌশল যাচাইয়ের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
৫ আগস্টের আগে পরিস্থিতি সম্পর্কে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা থাকার পরও রাষ্ট্রীয় কাঠামো এত দ্রুত ভেঙে পড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মনিরুল ইসলাম বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভেতরে কথিত ‘ডিপ স্টেট’-এর প্রভাবের দাবি করেন।
তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর একটি অংশ তৎকালীন সরকারের আন্দোলন মোকাবিলার পরিকল্পনার পেছনে ‘ছুরিকাঘাত’ করেছে। তার দাবি, অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত বিভিন্ন গোষ্ঠীর সমন্বয়ে একটি ‘মিনি ডিপ স্টেট’ কাজ করছিল, যারা সবসময় সরকারের পক্ষে নয়, কখনো কখনো সরকারের বিরুদ্ধেও ভূমিকা রাখে।
তবে সাক্ষাৎকারে মনিরুল ইসলামের এসব বক্তব্য তার ব্যক্তিগত দাবি ও বিশ্লেষণ হিসেবে উঠে এসেছে। এসব দাবির স্বাধীন কোনো যাচাই বা সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষের বক্তব্য ওই সাক্ষাৎকারের অংশে পাওয়া যায়নি।

