গ্যাস সংকটে দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া শিল্পকারখানার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের সরবরাহ কমিয়ে শিল্প খাতে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে গ্যাসের ওপর চাপ কমাতে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এসব কেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।
বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ জানিয়েছেন, লোডশেডিং কমানোর পাশাপাশি শিল্প খাতকে সচল রাখতে সরকার প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নিচ্ছে। এ কারণে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে এলএনজির তুলনায় ফার্নেস অয়েল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ তুলনামূলক কম। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এলএনজি সংগ্রহও কঠিন হয়ে পড়েছে। এমনকি স্পট মার্কেটে টেন্ডার করেও ২৬ আগস্টের নির্ধারিত এলএনজি কার্গোর জন্য সরবরাহকারী পাওয়া যায়নি।
গ্যাস সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় শনিবার রাত থেকে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের বরাদ্দ কমিয়ে শিল্প, সিএনজি ও আবাসিক খাতে বাড়ানো হয়েছে। আগে বিদ্যুৎকেন্দ্রে দৈনিক ৯৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হলেও এখন দেওয়া হচ্ছে ৮৫ কোটি ঘনফুট। অন্যদিকে শিল্প, বাসাবাড়ি, সিএনজি ও অন্যান্য গ্রাহকের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ১৩৫ কোটি ঘনফুট। সার খাতে দেওয়া হচ্ছে আরও ১৭ কোটি ঘনফুট গ্যাস।
রোববার বিকাল ৪টার হিসাবে দেশে মোট ২৩৭ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। এর মধ্যে এলএনজি থেকে এসেছে ৭৫ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট। তবে ২৬ আগস্টের জন্য কোনো এলএনজি কার্গো না পাওয়ায় ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত একই মাত্রায় গ্যাস সরবরাহ বজায় রাখা কঠিন হতে পারে বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা।
এদিকে দেশে ৫৩টির বেশি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা দৈনিক ৫ হাজার ৬৩৭ মেগাওয়াট। কিন্তু বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ১৪৭ মেগাওয়াট। বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকরা বলছেন, প্রয়োজনীয় বকেয়া পরিশোধ করা হলে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে সহজেই ৪ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।
গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) ফার্নেস অয়েলের মজুত বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে হঠাৎ করে ফার্নেস অয়েলের চাহিদা প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। ফলে বাড়তি চাহিদা মেটাতে তেল আমদানিও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
গ্যাস সংকটের কারণে গত এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশের শত শত শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও উৎপাদন সচল রাখতে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার বাড়িয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে।
সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গ্যাসের সরবরাহ সীমিত থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার বাড়িয়ে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি লোডশেডিং ব্যবস্থাপনায় রাজধানী ঢাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, ঢাকায় প্রথমে সহনীয় মাত্রায় এক থেকে দুই ঘণ্টা লোডশেডিং করা হবে; এরপর জেলা শহর এবং সবশেষে প্রত্যন্ত এলাকায় লোডশেডিং দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

