রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে ভর করে অর্থনীতিতে স্বস্তির আভাস

নিউজ ডেস্ক

বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার দিকে এগোলেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগে ধীরগতি, রপ্তানিতে স্থবিরতা, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। তবে রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।

মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) ত্রৈমাসিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে দেশের অর্থনীতির এমন চিত্র উঠে এসেছে। মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ কাটিয়ে উঠতে গিয়ে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে মিশ্র প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

প্রতিবেদনে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের আকর্ষণ থাকলেও অবকাঠামোগত দুর্বলতা, জ্বালানি সংকট, দুর্বল সঞ্চালনব্যবস্থা, নীতির ধারাবাহিকতার অভাব, জমির সংকট, দুর্নীতি এবং আইন ও বিধিবিধানের অস্বচ্ছ ও অসম প্রয়োগ বিনিয়োগে বাধা তৈরি করছে।

তবে নতুন সরকারের অধীনে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার যে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তা বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে এমসিসিআই। এ জন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কমেছে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ

অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বিনিয়োগে দুর্বলতার অন্যতম কারণ হিসেবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই হার ছিল ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ।

অন্যদিকে সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেড়েছে ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। একই সময়ে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে। জুনে ব্যাংক ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান ছিল ৫ দশমিক ৭০ শতাংশ।

উচ্চ সুদহার, তারল্য সংকট এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। এর প্রভাব পড়েছে শিল্প ও উৎপাদন খাতেও। তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ এবং উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ হয়েছে।

রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি

রাজস্ব আদায়েও প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা আদায় করেছে। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ১৭ দশমিক ৪০ শতাংশ।

তবে আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আদায় ১২ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে।

উন্নয়ন ব্যয়েও দুর্বলতা দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাত্র ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। আগের অর্থবছরে এ হার ছিল ৬৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। টানা দ্বিতীয় বছরের মতো এ হার কমে গত এক দশকের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।

সামনে কিছুটা স্বস্তির পূর্বাভাস

এমসিসিআই বলছে, নির্বাচনের পর অর্থনীতি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক সংঘাতের প্রভাব কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। ফলে আগামী দিনে অর্থনৈতিক সূচকগুলোতে মিশ্র প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।

আগামী তিন মাসে রপ্তানি, আমদানি ও রেমিট্যান্স বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আমদানি ব্যয় মেটাতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা চাপ তৈরি হতে পারে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি কমারও সম্ভাবনা দেখছে সংগঠনটি।

এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতের সংস্কার ও শক্তিশালীকরণ, বেসরকারি বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাড়ানো এবং বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা ধরে রাখাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে এমসিসিআই।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন