রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

ঐতিহাসিক গবেষণায় হযরত শাহজালাল (র:) সিলহেটী

নিউজ ডেস্ক

সিলেটের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে হযরত শাহজালাল মুজাররদ (রহ.) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। ৭০৩ হিজরি বা ১৩০৩-০৪ খ্রিস্টাব্দে সিলেট বিজয়ের পর ইসলাম প্রচারে তাঁর ভূমিকা নিয়ে নানা ঐতিহাসিক বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে তাঁর জন্মস্থান, বংশপরিচয় ও আধ্যাত্মিক ধারার উৎস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মত প্রচলিত রয়েছে।

প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় কয়েকটি উৎস বিশ্লেষণ করে কিছু গবেষক মনে করেন, শাহজালাল (রহ.)-এর সঙ্গে মধ্য এশিয়ার খাওয়ারিজম অঞ্চলের ঘনিষ্ঠ ঐতিহাসিক সম্পর্ক ছিল। এ ক্ষেত্রে ইবনে বতুতার ভ্রমণবৃত্তান্ত, সুফি জীবনীগ্রন্থ এবং হোসেনশাহী আমলের একটি শিলালিপিকে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

ইবনে বতুতার ভ্রমণবৃত্তান্তে শাহজালাল

শাহজালাল (রহ.) সম্পর্কে প্রাচীনতম গুরুত্বপূর্ণ বিবরণগুলোর একটি পাওয়া যায় মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতার ‘রিহলা’ গ্রন্থে। ১৪ শতকে ভারতীয় উপমহাদেশ ভ্রমণের সময় তিনি সিলেট অঞ্চলে এসে শাহজালাল (রহ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন বলে তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে উল্লেখ রয়েছে।

ইবনে বতুতার বর্ণনায় ওই সাধককে ‘শায়েখ জালালুদ্দিন অব তবরিজ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বিবরণ অনুযায়ী, শাহজালাল (রহ.)-এর খানকাহে তিনি কয়েক দিন অবস্থান করেন।

ইবনে বতুতা আরও জানান, স্থানীয় মানুষের একটি অংশ শাহজালাল (রহ.)-এর মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। এ কারণে তিনি ওই অঞ্চলে থেকে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। খানকাহে আগত ফকির, দরবেশ ও মুসাফিরদের সেবায় মানুষের দেওয়া দান ও উপহার ব্যয় করা হতো বলেও তাঁর বর্ণনায় উঠে আসে।

তুর্কিস্তানের সঙ্গে আধ্যাত্মিক যোগসূত্র

শাহজালাল (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক পরিচয় নিয়ে ‘গুলজারে আবরার’ গ্রন্থেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় বলে গবেষণামূলক লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তাঁকে তুর্কিস্তানি বংশোদ্ভূত হিসেবে বর্ণনা করার দাবি রয়েছে।

এ ছাড়া খাজা আহমদ ইয়াসাবি (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক ধারার সঙ্গে শাহজালাল (রহ.)-এর সম্পর্কের কথাও বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়। তবে এসব তথ্যের ক্ষেত্রে গ্রন্থের রচনাকাল ও তথ্যের উৎস বিবেচনায় নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

আইন-ই-আকবরিতে তবরেজি সূত্র

মোগল আমলের ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘আইন-ই-আকবরি’-তেও শাহজালাল (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক পরিচয় সম্পর্কে একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। আবুল ফজলের রচনায় তাঁকে সাঈদ তবরেজী (রহ.)-এর শিষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে গবেষণামূলক গ্রন্থে দাবি করা হয়েছে।

ইবনে বতুতার বর্ণনায় থাকা ‘তবরিজ’ পরিচয়ের সঙ্গে এই তথ্যের মিল থাকায় কিছু গবেষক শাহজালালের মধ্য এশীয় আধ্যাত্মিক যোগাযোগের বিষয়টি সামনে আনেন।

১৫০৫ সালের শিলালিপিতে ‘কুনিয়া’

শাহজালাল (রহ.)-এর জন্মস্থান নিয়ে আলোচনায় হোসেনশাহী আমলের একটি শিলালিপিও গুরুত্বপূর্ণ। ৯১১ হিজরি বা ১৫০৫ খ্রিস্টাব্দের ওই শিলালিপিতে ‘শায়খ জালাল মুজাররদ কুনিয়া’ ধরনের পরিচয় পাওয়া যায় বলে গবেষণামূলক গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষকদের একটি অংশের মতে, এখানে ‘কুনিয়া’ বলতে মধ্য এশিয়ার ঐতিহাসিক কুনিয়া বা কোনে-উর্গেন্চকে বোঝানো হয়েছে। শহরটি প্রাচীন খাওয়ারিজম অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।

এই ব্যাখ্যার ভিত্তিতে ইবনে বতুতার ‘তবরিজ’ উল্লেখ, সুফি জীবনীগ্রন্থে ‘তুর্কিস্তানি’ পরিচয় এবং শিলালিপির ‘কুনিয়া’—এই তিনটি তথ্যকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে শাহজালালের মধ্য এশীয় বংশপরিচয়ের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন কিছু গবেষক।

ইয়েমেনি পরিচয় নিয়েও রয়েছে মত

অন্যদিকে, শাহজালাল (রহ.)-কে ইয়েমেনের সঙ্গে যুক্ত করে একটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত মতও রয়েছে। বিভিন্ন পরবর্তী বর্ণনা ও লোকঐতিহ্যে তাঁর ইয়েমেনে অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। তাঁর জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আরব অঞ্চলে ভ্রমণ ও সেখানে অনুসারী গড়ে ওঠার বর্ণনাও প্রচলিত রয়েছে।

ফলে শাহজালাল (রহ.)-এর জন্মস্থান নিয়ে মধ্য এশিয়া ও ইয়েমেন—দুই ধরনের মতই আলোচনায় রয়েছে।

ইতিহাসে শাহজালালের অবস্থান

শাহজালাল (রহ.)-এর জন্মস্থান ও বংশপরিচয় নিয়ে এখনো সর্বসম্মত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেই। তবে প্রাচীন বিভিন্ন উৎসে তবরিজ, তুর্কিস্তান ও কুনিয়া অঞ্চলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের যে তথ্য পাওয়া যায়, তা ইতিহাস গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

তাঁর জীবন ও আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মধ্য এশিয়া, পারস্য, আরব অঞ্চল এবং বাংলার যোগাযোগ ছিল—এমন একটি বিস্তৃত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিভিন্ন সূত্রে উঠে আসে। তাই শাহজালাল (রহ.)-এর পরিচয় অনুসন্ধানে লোককথার পাশাপাশি সমকালীন ও প্রাচীন দলিল, শিলালিপি এবং সুফি ঐতিহ্যের উৎসগুলোও গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন