সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
Logo

বিজেপিকে ভোট না দেওয়ার ‘শাস্তি’ হিসেবে পানির সংযোগ বন্ধের অভিযোগ

নিউজ ডেস্ক

ভারতের কলকাতার কাশীপুর এলাকার জ্যোতিনগর কলোনিতে প্রায় এক মাস ধরে তীব্র পানির সংকট চলছে। স্থানীয়ভাবে ‘মোল্লা পাড়া’ নামে পরিচিত এলাকাটির প্রায় ৫ হাজার বাসিন্দা খাবার ও দৈনন্দিন ব্যবহারের পানির জন্য চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেকে বাধ্য হয়ে গঙ্গার পানি ব্যবহার করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক কারণে পরিকল্পিতভাবে এলাকায় পানির সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

কলকাতা পুরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন জ্যোতিনগর কলোনিতে প্রায় ৬০ বছর ধরে মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বেশ কিছু হিন্দু পরিবারও বসবাস করছে। এলাকার অধিকাংশ মানুষ নির্মাণশ্রমিক কিংবা বিভিন্ন ছোট কারখানায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

মেরামতের পরই বন্ধ পানির সংযোগ

বাসিন্দাদের ভাষ্য, গত ২৭ জুলাই কলকাতা পুরসভার কর্মীরা এলাকায় পানির পাইপলাইন মেরামতের কাজ শুরু করেন। ২৯ জুলাই কাজ শেষ হওয়ার পর কিছু সময়ের জন্য পানি সরবরাহও স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ওই রাতেই প্রায় সাড়ে ১১টার দিকে পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন তারা।

স্থানীয়দের দাবি, একই এলাকার অন্য অংশে পানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও জ্যোতিনগর কলোনির ছয়টি পানির কল এক মাস ধরে অকেজো হয়ে আছে। পরদিন এলাকার রাস্তার আলোর সংযোগও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন বাসিন্দারা।

গঙ্গার ঘাটে গিয়ে পানি সংগ্রহ

পানির সংকটের কারণে স্থানীয়দের অনেকেই গঙ্গার ঘাটে গিয়ে গোসল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজ সারছেন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা জাহানারা বিবি বলেন, শিশুদেরও মুখ ধোয়া ও গোসলের জন্য ঘাটে যেতে হচ্ছে। অনেকেই নদীতে পড়ে গেছেন এবং অল্পের জন্য দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

বাসিন্দাদের অভিযোগ, দূষিত নদীর পানি ব্যবহারের কারণে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে জ্বর, মাথাব্যথা ও চর্মরোগের মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে। পিচ্ছিল ঘাটে পড়ে কয়েকজন আহতও হয়েছেন বলে জানান তারা।

শিক্ষার্থী ও নারীদের ভোগান্তি

পানির সংকটের প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের ওপরও। ১৫ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী ইসমা খাতুনের দাবি, পানি সংকটের কারণে পড়াশোনা ও স্কুলে যাতায়াতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা নেই বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এদিকে রাস্তার আলো বন্ধ থাকায় রাতের বেলায় নারীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পানির অভাবে স্থানীয় জামে মসজিদে ওজুর পানির সংকট দেখা দিয়েছে বলেও জানিয়েছেন বাসিন্দারা।

রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ

পানির সংকটের জন্য স্থানীয়রা রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকে দায়ী করছেন। তাদের অভিযোগ, বিধানসভা নির্বাচনের পর স্থানীয় বিজেপি বিধায়কের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে সংখ্যালঘুদের একটি অংশ তাঁকে ভোট না দেওয়ায় তাদের জন্য কাজ না করার কথা বলা হয়েছিল বলে স্থানীয়দের দাবি।

বাসিন্দাদের অভিযোগ, পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনাটি ওই রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে এলাকায় বস্তি উচ্ছেদের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কিছু বিজেপি কর্মী তাদের উচ্ছেদের হুমকি দিয়েছেন।

ট্যাঙ্কারে পানি সরবরাহ

সংকট মোকাবিলায় সিপিআই(এম) ও পশ্চিমবঙ্গ বস্তি উন্নয়ন সমিতির পক্ষ থেকে কয়েক দিন পরপর পানির ট্যাঙ্কারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। স্থানীয় সিপিআই(এম) নেতা আলমগীর বিশ্বাস বলেন, প্রায় ৫ হাজার মানুষের জন্য তিন-চার দিন পরপর একটি পানির ট্যাঙ্কার কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়।

এদিকে সিপিআই(এম)-এর উদ্যোগে এলাকার রাস্তার কিছু বাতিও মেরামত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত পানির সংযোগ পুনঃস্থাপন, পর্যাপ্ত বিকল্প পানির ব্যবস্থা এবং রাস্তার আলো সচল করার দাবি জানিয়েছেন।

তাদের অভিযোগ, পুরসভা ও পুলিশের কাছে একাধিকবার জানানো হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। এক মাস ধরে চলা এই সংকটের দ্রুত অবসান না হলে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন