রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ বাতিলের মেয়াদ ফের বাড়াল কাতার

নিউজ ডেস্ক

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত থাকায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে ঘোষিত ‘ফোর্স মেজার’-এর মেয়াদ আরও বাড়িয়েছে কাতারএনার্জি। এর ফলে ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এলএনজি কার্গো সরবরাহ আগামী অক্টোবর পর্যন্ত বাতিল হতে পারে বলে ক্রেতাদের জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশও রয়েছে।

কাতারি সংবাদমাধ্যম দোহা নিউজ ও ইউরোনিউজের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাতারএনার্জির সরবরাহ স্থগিতের কারণে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ইতালিসহ কয়েকটি দেশের এলএনজি আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফোর্স মেজার ঘোষণা করা হলে অস্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা পরিস্থিতির কারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট কিছু চুক্তিগত দায় ও বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পেতে পারে।

সম্প্রতি ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের জন্য এলএনজি সরবরাহে জারি করা ফোর্স মেজারের মেয়াদ সেপ্টেম্বরের পরও বাড়িয়েছে কাতারএনার্জি। পাকিস্তানি ক্রেতাদেরও চলতি সপ্তাহে জানানো হয়েছে, অক্টোবর পর্যন্ত কার্গো বাতিলের পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে।

ইউরোপের ক্রেতারাও একই ধরনের নোটিশ পেতে শুরু করেছেন। ইতালির জ্বালানি প্রতিষ্ঠান এডিসন জানিয়েছে, তাদের জন্য কাতারএনার্জির এলএনজি সরবরাহ স্থগিতের সময়সীমা নভেম্বরের শুরু পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

এডিসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইতালির আদ্রিয়াটিক এলএনজি রিসিভিং টার্মিনালের জন্য নির্ধারিত আরও পাঁচটি কার্গো সরবরাহ করতে পারবে না কাতারএনার্জি। সব মিলিয়ে বাতিল হওয়া কার্গোর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯টিতে। তবে জ্বালানি চাহিদা পূরণে বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের ব্যবস্থা করছে প্রতিষ্ঠানটি।

বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে ক্রেতারা

কাতারের এলএনজি সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্নের কারণে এশিয়া ও ইউরোপের ক্রেতাদের বিকল্প উৎস খুঁজতে হচ্ছে। কেউ অন্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে, আবার কেউ গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজি পরিবহন প্রায় বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল কবে স্বাভাবিক হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

কাতারএনার্জি গত মার্চে প্রথমবার এলএনজি সরবরাহে ফোর্স মেজার ঘোষণা করে। এরপর পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় প্রতি মাসে এর মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে।

কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির বৈশ্বিক গবেষণা ফেলো অ্যান-সোফি করবেউর মতে, রাজনৈতিক সমাধান বা সংশ্লিষ্ট প্রধান পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হলে বর্তমান পরিস্থিতি আরও কিছুদিন চলতে পারে।

তিনি বলেন, স্বাভাবিক এলএনজি রপ্তানি কখন পুরোপুরি শুরু হবে, সে বিষয়ে কাতারএনার্জির কাছে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে মাসে মাসে সরবরাহ বাতিলের মেয়াদ বাড়াতে হচ্ছে।

কাতারের এলএনজি রপ্তানি কমেছে ব্যাপকভাবে

পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে কাতারের উপস্থিতি ব্যাপকভাবে কমেছে। আইসিআইএসের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের প্রথম ছয় মাসে কাতার মাত্র ১৮টি এলএনজি কার্গো রপ্তানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ে দেশটি ৫০৯টি কার্গো রপ্তানি করেছিল।

ইউরোনিউজের হিসাবে, এলএনজি বিক্রিতে কাতারের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার।

কাতারের ঘাটতি আংশিকভাবে পূরণের চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ অন্যান্য এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ। নাইজেরিয়া ও মালয়েশিয়াতেও উৎপাদন কিছুটা বেড়েছে। তবে এসব উদ্যোগের পরও বৈশ্বিক সরবরাহ ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এশিয়ার কিছু দেশ গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে বা বিকল্প জ্বালানিতে গিয়ে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ইউরোপের কিছু দেশও উচ্চমূল্যের স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কেনার পরিবর্তে নিজেদের মজুত ব্যবহার করছে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে বাংলাদেশ-পাকিস্তান-ভারত

গবেষক অ্যান-সোফি করবেউর মতে, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে দীর্ঘ সময় এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হলে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যে বড় ধরনের ধাক্কা আসতে পারে।

তবে সব আমদানিকারক দেশের ওপর এর প্রভাব সমান হবে না। তাঁর মতে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারত তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে জাপান কিছুটা নিরাপদ অবস্থানে আছে, কারণ দেশটি কাতার থেকে তুলনামূলক কম এলএনজি আমদানি করে এবং তাদের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বড় অংশ তেল বা মার্কিন গ্যাসের দামের সঙ্গে সম্পর্কিত।

করবেউর পূর্বাভাস, গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি পুরোপুরি আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।

হরমুজের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে সংকট

ইরান সংঘাতের আগে বিশ্বের মোট এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। বর্তমানে কিছু তেলবাহী ট্যাংকার এই জলপথ ব্যবহার করলেও এলএনজিবাহী জাহাজের চলাচল অনেক বেশি সীমিত।

এর অন্যতম কারণ, এলএনজি পরিবহনে ব্যবহৃত জাহাজগুলো বিশেষায়িত এবং এগুলোর সহজ বিকল্প পাওয়া কঠিন। ফলে সংঘাতের মধ্যে এসব জাহাজের চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কাতারএনার্জির প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং কাতারের জ্বালানিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সাদ শেরিদা আল-কাবি জানিয়েছেন, রাস লাফানে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে কাতারের এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতা অন্তত ১৭ শতাংশ কমে গেছে।

দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট বাংলাদেশের মতো কাতারনির্ভর এলএনজি আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন