রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

এআই দিয়ে সাইবার হামলা বাড়ছে

নিউজ ডেস্ক

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার দ্রুত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার হামলার ঝুঁকিও বাড়ছে। ভবিষ্যতে এআই কাজে লাগিয়ে আরও দ্রুত, স্বয়ংক্রিয় ও জটিল সাইবার হামলা চালানো সম্ভব হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে আগেভাগেই সাইবার নিরাপত্তা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে বিশ্বের প্রায় ১০০টি প্রতিষ্ঠান।

গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ব্যাংক, অর্থপ্রযুক্তি কোম্পানি এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো এ বিষয়ে প্রকাশিত একটি খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছে।

চিঠিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই এআই-নির্ভর সাইবার হামলা আরও ব্যাপক ও জটিল হয়ে উঠতে পারে। অথচ বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা এই ধরনের পরিবর্তিত হুমকি মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়।

হাসপাতাল ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ঝুঁকি

চিঠিতে বলা হয়েছে, সাইবার প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার জন্য হাতে খুব বেশি সময় নেই। বিশেষ করে হাসপাতাল, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, এসব খাতের সাইবার নিরাপত্তায় দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় অর্থ ও জনবল বরাদ্দ করা হয়নি। ফলে এআইয়ের সক্ষমতা দ্রুত বাড়তে থাকলে দুর্বল অবকাঠামোগুলো আরও বড় ধরনের সাইবার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

সরকারগুলোর প্রতি প্রতিরক্ষামূলক কাজে ব্যবহারযোগ্য এআই প্রযুক্তি সরবরাহ এবং নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা চালানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পর্যাপ্ত অর্থ, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

এআই ব্যবহার করে হামলার নজির

সাম্প্রতিক কয়েকটি সাইবার হামলার ঘটনায় এআইয়ের সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চীনভিত্তিক হ্যাকাররা মার্কিন সিনেট, নাসা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিচার বিভাগের বিভিন্ন ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করেছে।

একই সঙ্গে এআই ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে প্রচলিত নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক ও মেটার তৈরি বিভিন্ন এআই ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এমন আচরণের তথ্য প্রকাশ পেয়েছে।

জুলাইয়ে ওপেনএআইয়ের কয়েকশ এআই এজেন্টের একটি পরীক্ষায় দেখা যায়, তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য গোপন বার্তা আদান-প্রদানের পদ্ধতি তৈরি করতে সক্ষম। পরে সমন্বিতভাবে হাগিং ফেসের একটি ব্যবস্থায় হামলা চালানোর ঘটনাও সামনে আসে। ঘটনাটিকে বিশ্বের প্রথম এআই-চালিত সাইবার হামলা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

হাগিং ফেসও নতুন খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছে। ওই ঘটনার তদন্তে প্রতিষ্ঠানটি চীনের জেডএআইয়ের তৈরি একটি এআই ব্যবস্থার সহায়তা নিয়েছিল।

গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে বাড়ছে হামলা

যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত সাতটি পানি ও পয়োনিষ্কাশন প্রতিষ্ঠান সাম্প্রতিক সময়ে সাইবার হামলার শিকার হয়েছে। এসব ঘটনার পর দেশটির কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছে।

তবে সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠছে এ কারণে যে সবচেয়ে শক্তিশালী এআই ব্যবস্থা এখনো সবার জন্য সহজলভ্য নয়। ফলে যেসব গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রতিষ্ঠানের পর্যাপ্ত অর্থ ও জনবল নেই, তারা উন্নত নিরাপত্তা প্রযুক্তির সুবিধা থেকেও পিছিয়ে থাকতে পারে।

খোলা চিঠিতে শক্তিশালী এআই তৈরি করা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি দায়িত্বশীলভাবে এসব প্রযুক্তির সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে সীমিত সম্পদের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাইবার নিরাপত্তায় সহায়তা করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

‘এআই হামলার ঢেউ’ আসতে পারে

এআই প্রযুক্তির ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করা গবেষক অ্যান্ড্রু ইউন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, সামনে এআই ব্যবহার করে সাইবার হামলার নজিরবিহীন ঢেউ দেখা যেতে পারে।

তবে শুধু প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করাই যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, যেসব প্রতিষ্ঠান এআইয়ের সক্ষমতা দ্রুত বাড়াচ্ছে, তাদের নিজেদের ঘোষিত নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এ খাতে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ঝুঁকিপূর্ণ এআই ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও আলোচনা চলছে। দেশটির কয়েকজন সিনেটর ‘কিল সুইচ আইন’ নামে একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। এর মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এআই ব্যবস্থা বন্ধ করার ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

নোবেল পুরস্কারজয়ী প্রযুক্তিবিদ জিওফ্রি হিন্টনও এআইয়ের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, কোনো পর্যায়ে এআই মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান হয়ে উঠলে এবং এর ঝুঁকি মোকাবিলার কার্যকর উপায় না পাওয়া গেলে পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হতে পারে।

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর খোলা চিঠির মূল বার্তা হলো—এআইয়ের সক্ষমতা আরও বাড়ার আগেই সাইবার প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে হবে। কারণ হামলার প্রযুক্তি যেভাবে দ্রুত এগোচ্ছে, সেই গতিতে প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হলে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও বৈশ্বিক ডিজিটাল ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন