সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
Logo

ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনে তীব্র অন্তর্দ্বন্দ্ব

নিউজ ডেস্ক

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা, নেতৃত্ব ও কৌশল নিয়ে যখন একের পর এক প্রশ্ন উঠছে, ঠিক তখনই ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন নতুন মাত্রা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি সেক্রেটারি ড্যানিয়েল পি. ড্রিসকলের পদত্যাগ সেই দ্বন্দ্বকে আর পর্দার আড়ালে রাখেনি।

সোমবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন ড্রিসকল। হোয়াইট হাউস তার পদত্যাগের নির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ করেনি। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে কয়েক মাস ধরে তার সম্পর্কের অবনতি চলছিল। সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের অপসারণ এবং বাহিনীর আধুনিকায়নের দিকনির্দেশনা নিয়ে তাদের মধ্যে মতবিরোধ ছিল।

দ্বন্দ্বটা আসলে কোথায়?

ড্রিসকল ছিলেন সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন, দ্রুত অস্ত্র সংগ্রহ এবং তুলনামূলক কম ব্যয়ে নতুন সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রবক্তা। বিশেষ করে ড্রোন ও ড্রোন প্রতিরোধী প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ওপর তিনি জোর দিয়েছিলেন। বড় প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতারও সমালোচনা করেছিলেন তিনি।

অন্যদিকে হেগসেথ দায়িত্ব নেওয়ার পর মার্কিন সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন আনেন। সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ জেনারেল র‌্যান্ডি জর্জকে অপসারণসহ একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার পদে পরিবর্তন আসে। এসব সিদ্ধান্ত ড্রিসকলের সঙ্গে তার দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দেয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

অর্থাৎ, এটি কেবল দুই কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল—এমনটা দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। এর পেছনে ছিল সেনাবাহিনীকে কীভাবে পরিচালনা করা হবে, কোন ধরনের নেতৃত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং আধুনিক যুদ্ধের জন্য বাহিনীকে কীভাবে প্রস্তুত করা হবে—এসব মৌলিক প্রশ্ন।

যুদ্ধের মাঝখানে নেতৃত্বের সংকট

ড্রিসকলের পদত্যাগের সময়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র তখন ইরান সংঘাতে সরাসরি সামরিকভাবে জড়িত। মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। ফলে সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে ধারাবাহিক নেতৃত্ব পরিবর্তন কেবল প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে যুদ্ধের প্রস্তুতি, সরঞ্জাম সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক পরিকল্পনায়।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ড্রিসকল সেনাবাহিনীর রূপান্তর ও যুদ্ধপ্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তার মতে, নেতৃত্বের পরিবর্তন এবং জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের অপসারণ এসব উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করছিল।

এখানেই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—যুদ্ধের সময় সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের পরিবর্তন কি বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, নাকি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা দুর্বল করছে?

হেগসেথের নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন

ড্রিসকলের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে পিট হেগসেথের নেতৃত্ব নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে পেন্টাগনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং সামরিক কমান্ডারদের পরামর্শ উপেক্ষা করা হচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নও মার্কিন সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।

একটি প্রতিবেদনে কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কমান্ডারের উদ্বেগের কথা প্রকাশিত হলেও পেন্টাগন তা খারিজ করেছে এবং বলেছে, সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ।

তবে সমালোচকদের কাছে বিষয়টি উদ্বেগের কারণ অন্য জায়গায়। তাদের আশঙ্কা, অভিজ্ঞ সামরিক কর্মকর্তাদের দ্রুত সরিয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলে বাহিনীর পেশাদার সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো দুর্বল হতে পারে। ড্রিসকলের বিদায়ের পর সেই বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ট্রাম্পের জন্যও এটি অস্বস্তির

ড্রিসকল সরাসরি ট্রাম্পের কাছে পদত্যাগপত্র দিয়েছেন এবং একই সময়ে সেনাবাহিনীর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলেছেন। হোয়াইট হাউস অবশ্য ড্রিসকলের কাজের প্রশংসা করেছে এবং ট্রাম্পের সামরিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে তার ভূমিকার কথা তুলে ধরেছে।

এখানে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি রাজনৈতিক জটিলতাও তৈরি হচ্ছে। একদিকে প্রেসিডেন্ট শক্তিশালী ও আধুনিক সামরিক বাহিনীর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন; অন্যদিকে সেই বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বেই যদি ধারাবাহিকভাবে পদত্যাগ ও অপসারণ ঘটে, তাহলে প্রশাসনের সামরিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে শুধু অস্ত্র বা সেনাসংখ্যা নয়, নেতৃত্বের স্থিতিশীলতা এবং সামরিক পরিকল্পনার ধারাবাহিকতাও গুরুত্বপূর্ণ।

সেনাবাহিনী কি নেতৃত্বশূন্যতার ঝুঁকিতে?

ড্রিসকলের বিদায়ের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—সেনাবাহিনীর বেসামরিক নেতৃত্বের পাশাপাশি সামরিক নেতৃত্বেও বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে শূন্যতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ড্রিসকল হেগসেথের অধীনে পদত্যাগ বা অপসারণের মুখে পড়া সর্বশেষ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের একজন।

আরও একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ডেভ ফিটজেরাল্ডও পদত্যাগ করতে পারেন বলে সূত্র জানিয়েছে। তিনি সেনাবাহিনীর উদ্ভাবন ও আধুনিকায়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

ফলে বিষয়টি এখন আর শুধু ড্রিসকল বনাম হেগসেথ দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই। এটি মার্কিন সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।

সামনে বড় পরীক্ষা

ড্রিসকলের পদত্যাগকে তাই ট্রাম্প প্রশাসনের একটি বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ কম। এটি একই সঙ্গে তিনটি বড় বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে—মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের চাপ, পেন্টাগনের অভ্যন্তরে নেতৃত্বের পুনর্বিন্যাস এবং মার্কিন সেনাবাহিনীকে আধুনিক যুদ্ধের উপযোগী করে গড়ে তোলার পথ নিয়ে মতপার্থক্য।

ড্রিসকলের বিদায়ের পর এখন মূল প্রশ্ন হবে, তার স্থলাভিষিক্ত কে হচ্ছেন এবং নতুন নেতৃত্ব হেগসেথের সঙ্গে কতটা সমন্বয় করে কাজ করতে পারবে।

কারণ যুদ্ধের সময়ে সামরিক নেতৃত্বে পরিবর্তন নিজেই বড় ঝুঁকি। আর সেই পরিবর্তনের পেছনে যদি নীতিগত মতবিরোধ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কাজ করে, তাহলে এর প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও পড়তে পারে।

ড্রিসকলের পদত্যাগ তাই শুধু একজন সেনামন্ত্রীর বিদায় নয়; এটি ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক নীতির ভেতরে চলমান টানাপোড়েনের একটি দৃশ্যমান বহিঃপ্রকাশ।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন