‘মক্কা চুক্তি’কে ইরানবিরোধী কোনো জোট হিসেবে দেখছে না তেহরান। বরং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন হিসেবেই চুক্তিটিকে দেখছে ইরান। বাংলাদেশ এই জোটে যুক্ত হলেও তাতে তেহরানের কোনো উদ্বেগ নেই বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমী।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।
রাষ্ট্রদূত বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের কোনো বিরোধ নেই। তুরস্ক ও পাকিস্তান ইরানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং সৌদি আরবের সঙ্গেও তেহরানের সুসম্পর্ক রয়েছে। ফলে মক্কা চুক্তি নিয়ে ইরানের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে জালিল রাহিমী বলেন, ঢাকা ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। তাই বাংলাদেশের কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েই ইরান উদ্বিগ্ন নয়। তার দাবি, মক্কা চুক্তি ইরানের বিরুদ্ধে নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতার একটি ইঙ্গিত।
যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
মক্কা চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের স্বার্থে গঠিত হচ্ছে—বিশেষজ্ঞদের এমন বক্তব্যও নাকচ করেন ইরানের রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, এমন এক সময়ে এই চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিয়ে ওয়াশিংটন নিজেই উদ্বিগ্ন।
তার ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের জন্য ভূমি দেওয়া এবং মার্কিন অস্ত্র কেনার আহ্বান জানিয়েছে। এর বিনিময়ে এসব দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ওয়াশিংটন।
ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক অভিযানের বিভিন্ন লক্ষ্য নিয়েও কথা বলেন জালিল রাহিমী। তার দাবি, রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করা এবং বিশ্বে মার্কিন সামরিক শক্তি প্রদর্শন—এসব লক্ষ্য থাকলেও তা অর্জিত হয়নি।
তিনি আরও দাবি করেন, ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আসেনি এবং দেশটির সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামও ইরানের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
রাষ্ট্রদূতের ভাষায়, মক্কা চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরাজয়ের একটি ‘সম্পূরক অংশ’। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো এখন উপলব্ধি করছে যে বিপুল পরিমাণ মার্কিন অস্ত্র থাকলেই প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
আহ্বান পেলে চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয় বিবেচনা করবে ইরান
মক্কা চুক্তিতে ইরানকে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে জালিল রাহিমী বলেন, তেহরান নিজ থেকে কোনো প্রস্তাব দেয়নি। তবে চুক্তির সদস্য দেশগুলো ইরানকে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানালে বিষয়টি বিবেচনা করবে তেহরান।
রাষ্ট্রদূত জানান, প্রায় এক দশক আগে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিয়ে মক্কা চুক্তির মতো দুটি উদ্যোগের প্রস্তাব দিয়েছিল। এর একটি ছিল ‘পরমাণু অস্ত্রমুক্ত মধ্যপ্রাচ্য’ প্রতিষ্ঠা, যাতে অঞ্চলটির কোনো দেশের কাছেই পারমাণবিক অস্ত্র না থাকে। তবে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ওই উদ্যোগে সমর্থন দেয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
ইরানের আরেকটি প্রস্তাব ছিল মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামিক দেশগুলোর মধ্যে একটি ‘যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ গঠন। কিন্তু সে সময় আরব দেশগুলো এতে সমর্থন দেয়নি। তাদের ধারণা ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতাই আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট।
বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব ও জর্ডানের প্রসঙ্গ টেনে ইরানের রাষ্ট্রদূত প্রশ্ন রাখেন—যুক্তরাষ্ট্র কি এসব দেশকে তাদের প্রত্যাশিত নিরাপত্তা দিতে পেরেছে?
বক্তব্যের শেষদিকে তিনি পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত উদ্ধৃত করে আরব দেশগুলোর প্রতি বার্তা দেন।

