আগামী ১৫ দিনের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান উন্নতি হবে বলে আশাবাদ জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। আগস্টে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিয়ে যে দুর্ভোগ তৈরি হয়েছিল, সেপ্টেম্বর মাসে তার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে চলমান বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুলের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বিকেল সাড়ে ৩টায় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তাতে দেশের মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন। এ পরিস্থিতির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
প্রতিমন্ত্রীর দাবি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের ভুল নীতির পরিণতিতে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকট যুক্ত হয়ে জ্বালানি সরবরাহে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।
গ্যাসের ওপর বিদ্যুৎ উৎপাদনের অতিনির্ভরতা
বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার সীমাবদ্ধতার বিষয়টি সংসদে তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট। এই সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন।
কিন্তু দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে বর্তমানে প্রতিদিন ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেশি গ্যাস ব্যবহার করলে শিল্প ও আবাসিক খাতে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বিদ্যুৎ, শিল্প ও গৃহস্থালি—এই তিন খাতে ভারসাম্য রেখে গ্যাস বিতরণ করতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট বন্ধ
চলমান সংকটের পেছনে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট বন্ধ থাকাকেও অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
তিনি জানান, কারিগরি ত্রুটির কারণে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬১৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ইউনিট বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। একই ক্ষমতার মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বন্ধ আছে।
এ ছাড়া ভারতের আদানি গ্রুপ থেকে চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ না পাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তি অনুসারে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে দিনে প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যায় প্রায় ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
এফএসআরইউ ত্রুটিতে জ্বালানি সরবরাহে চাপ
আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত দুটি ভাসমান টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় চাপ তৈরি হয়েছিল বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, গত ২১ জুলাই একটি এফএসআরইউতে ত্রুটি দেখা দেয়। সেটি মেরামতে প্রায় ২১ থেকে ২২ দিন সময় লাগে। এর প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। তবে সৃষ্ট সংকটের প্রায় ৮৮ শতাংশ সমাধান করা সম্ভব হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে দ্রুত পায়রা ও মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বন্ধ ইউনিট চালুর ওপর গুরুত্ব দেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তাঁর আশা, আগামী ১৫ দিনের মধ্যেই বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।
আগামী গ্রীষ্মে রুফটপ সোলারে গুরুত্ব
আগামী গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় রুফটপ সোলারসহ দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সরকার রুফটপ সোলার নীতি গ্রহণ করেছে। এর ফলে আগামী গ্রীষ্মে চলতি সময়ের মতো বিদ্যুৎ সংকটজনিত দুর্ভোগে মানুষকে পড়তে হবে না বলে সরকার আশাবাদী।
সংসদ সদস্যদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে উদ্বেগকে স্বাভাবিক উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জনগণের প্রতিনিধিদের প্রকৃত পরিস্থিতি জানানো এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে থাকা ভুল বোঝাবুঝি দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

