দেশের সব নাগরিককে জন্মের পরপরই একক পরিচয়পত্র দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডেনটিটি’ বা ‘এক-আইডি’ নামে প্রস্তাবিত এই পরিচয়পত্র নাগরিকের আজীবন স্থায়ী ও স্বতন্ত্র পরিচয় হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণেও এটি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ ‘ডিজিটাল সার্ভিস ট্রান্সফরমেশন ফর অ্যাকসেস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’ বা ‘ডি-স্টার’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পটির অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মামুনুর রশীদ ভূঞা।
বর্তমানে জন্মের পর শিশুদের জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়া হয়। ১৮ বছর বয়স হলে নাগরিকরা জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি পান। তবে প্রস্তাবিত এক-আইডি ব্যবস্থায় বয়সের কোনো সীমা থাকবে না। জন্মের পরই নাগরিকের জন্য একটি স্বতন্ত্র ডিজিটাল পরিচয় তৈরি করা হবে। এই ব্যবস্থা চালু হলে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে একই তথ্য বারবার দেওয়ার প্রয়োজন কমে আসবে।
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ভবিষ্যতে বিদ্যমান বিভিন্ন কার্ডের কার্যকারিতা ধীরে ধীরে এক-আইডির সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মাধ্যমে পাওয়া বিভিন্ন সেবাও এক-আইডির আওতায় আনার চিন্তা করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
একক পরিচয়পত্র তৈরির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, এস্তোনিয়া ও ভারতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ নতুন ব্যবস্থার ধারণাকে ‘একজন নাগরিক, একটি ডিজিটাল পরিচয়, একটি ওয়ালেট’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ একজন নাগরিকের একটি পরিচয় থাকবে, সেটিই হবে তার ডিজিটাল পরিচয় এবং এর মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে এক-আইডিতে ঠিক কী ধরনের তথ্য সংরক্ষণ করা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি।
প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জনশুমারির তথ্য বিবেচনায় নিয়ে প্রায় ১৮ কোটি নাগরিকের জন্য পরিচয়পত্র তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে কার্ড উৎপাদন ও মুদ্রণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২০ কোটি।
প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি পলিকার্বোনেট চিপ কার্ড উৎপাদন ও মুদ্রণে ব্যয় হবে দুই মার্কিন ডলার, যা বর্তমান বিনিময় হারে প্রায় ২৪৬ টাকা। এর সঙ্গে প্রতিটি কার্ড বিতরণ ও সরবরাহে আরও এক ডলার বা প্রায় ১২৩ টাকা ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে। ফলে উৎপাদন, মুদ্রণ, বিতরণ ও সরবরাহ মিলিয়ে প্রতিটি কার্ডে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৬৯ টাকা।
প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ৭ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা এবং বিশ্বব্যাংকের ঋণ থেকে পাওয়া যাবে ১ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা।
প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের খাত হিসেবে কার্ড উৎপাদন ও মুদ্রণ, বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ এবং বিতরণ কার্যক্রমকে ধরা হয়েছে। এসব কাজে মোট ৭ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে।
বর্তমানে দেশে জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও কর শনাক্তকরণ নম্বরসহ বিভিন্ন ধরনের পরিচয়পত্র ও শনাক্তকারী নম্বর চালু আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব তথ্যভান্ডারের মধ্যে কার্যকর আন্তসংযোগ তৈরি করা গেলে নাগরিকদের কাছ থেকে একই তথ্য বারবার নেওয়ার প্রয়োজন কমবে। এতে সরকারি সেবা গ্রহণে ভোগান্তি কমার পাশাপাশি সেবা দেওয়ার প্রক্রিয়াও আরও দ্রুত ও কার্যকর হতে পারে।

