দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। বর্তমানে ব্যাংক থেকে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকা ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকাই খেলাপি। খেলাপি ঋণের অনুপাতের দিক থেকে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠে এসেছে, এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনকেও ছাড়িয়ে গেছে।
একসময় বিশ্বের সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের হার ছিল ইউক্রেনে। তবে পুরোনো খেলাপি ঋণ অবলোপন, ঋণ আদায় এবং ভালো মানের নতুন ঋণ বাড়ানোর মাধ্যমে দেশটি দ্রুত খেলাপি ঋণের হার কমিয়ে এনেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে এতদিন বিভিন্ন অনিয়মের কারণে আড়ালে থাকা ও বেনামি ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আসায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের বিপরীতে এর হার ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
চলতি বছরের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে খেলাপি ঋণ সর্বোচ্চ ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমান খেলাপি ঋণের বড় অংশ সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হয়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ঋণ পুনঃতফসিল, বিশেষ ছাড় এবং হিসাবের বিভিন্ন পরিবর্তনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যাগ্রস্ত অনেক ঋণকে নিয়মিত হিসেবে দেখানো হয়েছিল।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান যাচাই এবং দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষায় অনিয়ম, জালিয়াতি ও বেনামি ঋণের নানা তথ্য সামনে আসে। এর ফলে আগে নিয়মিত হিসেবে দেখানো বিপুল পরিমাণ ঋণ এখন খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংক। এসব ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি ইতোমধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি আরও কয়েকটি ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের অর্ধেকের বেশি খেলাপি হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দেওয়া ভুয়া ও বেনামি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকিং তদারকি, ব্যবসায় মন্দা এবং জ্বালানি সংকট খেলাপি ঋণ বাড়ার অন্যতম কারণ।
খেলাপি ঋণের হার নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকও বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ঋণ শ্রেণীকরণ ও সঞ্চিতি সংরক্ষণের নিয়ম আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে। পাশাপাশি দুর্বল ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান পর্যালোচনা, কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি চালু করা হয়েছে।
এসব সংস্কারের ফলে এতদিন নিয়মিত হিসেবে দেখানো অনেক সমস্যাগ্রস্ত ঋণ নতুন করে শনাক্ত হয়ে খেলাপির তালিকায় যুক্ত হচ্ছে। ফলে স্বল্পমেয়াদে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে ঋণখেলাপিদের বিভিন্ন ধরনের ছাড়ও দেওয়া হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঋণ অবলোপন বা পুনঃতফসিলের মাধ্যমে কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ কমানো সম্ভব হলেও এতে প্রকৃত পাওনা আদায় নিশ্চিত হয় না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ) সতর্ক করেছে, কঠোর ঋণ শ্রেণীকরণনীতি ও সম্পদের মান যাচাইয়ের ফলে ব্যাংক খাতে আরও খেলাপি ঋণের তথ্য সামনে আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাপি ঋণ কমাতে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সম্পদ জব্দ করে অর্থ আদায়, দ্রুত ঋণসংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তি, ব্যাংকের পরিচালনা ও ঋণ অনুমোদনে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ এবং নতুন করে খারাপ ঋণ সৃষ্টির পথ বন্ধ করতে হবে।
তাদের মতে, এসব পদক্ষেপ ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে মধ্যমেয়াদে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানো সম্ভব। তবে নির্বিচারে পুনঃতফসিল বা বিশেষ সুবিধা দেওয়া অব্যাহত থাকলে সাময়িকভাবে খেলাপি ঋণের হার কমলেও ব্যাংক খাতের মৌলিক সমস্যার সমাধান হবে না।

