বয়ঃসন্ধিকাল শিশুর জীবন থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পথে একটি স্বাভাবিক জৈবিক, শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের সময়। সাধারণত মেয়েদের ক্ষেত্রে ৮ থেকে ১৩ বছর এবং ছেলেদের ক্ষেত্রে ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সকে বয়ঃসন্ধিকাল হিসেবে ধরা হয়।
এই সময়ে শরীরে দ্রুত উচ্চতা ও ওজন বৃদ্ধি পায়। মেয়েদের ঋতুস্রাব শুরু হয় এবং ছেলেদের কণ্ঠস্বর ভারীসহ নানা শারীরিক পরিবর্তন দেখা দেয়। ফলে এ সময় শরীরে পুষ্টির চাহিদাও বেড়ে যায়। তাই বয়ঃসন্ধিকালে শিশু-কিশোরদের খাবারের বিষয়ে বাড়তি সচেতন থাকা জরুরি।
বয়ঃসন্ধিকালে যেসব শারীরিক সমস্যা হতে পারে
নিয়মিত ঋতুস্রাবের কারণে কিশোরীদের শরীরে আয়রনের চাহিদা বেড়ে যায়। পর্যাপ্ত আয়রন না পেলে রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া দেখা দিতে পারে। এতে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা ও পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে।
কৈশোরে হাড়ের গঠন ও ঘনত্ব দ্রুত বাড়ে। এ সময় পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি না পেলে হাড়ের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে এবং পরবর্তী জীবনে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এ ছাড়া ভিটামিন এ, বি-ভিটামিন ও জিঙ্কের ঘাটতি হলে ত্বক ও চুলের সমস্যা দেখা দিতে পারে। মুখের কোণে ঘা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে বিভিন্ন সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
খাদ্যতালিকায় যেসব খাবার রাখবেন
বয়ঃসন্ধিকালে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি হলে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। তাই সন্তানদের পছন্দের খাবারকে যতটা সম্ভব স্বাস্থ্যকর উপায়ে তৈরি করে দেওয়া উচিত।
পর্যাপ্ত পানি: কিশোর-কিশোরীদের প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি। বিশেষ করে শারীরিক পরিশ্রম বা গরমের সময় পানিশূন্যতা এড়াতে পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ করতে হবে।
শাকসবজি ও আঁশযুক্ত খাবার: প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও আঁশযুক্ত খাবার রাখা উচিত। এগুলো হজমশক্তি ভালো রাখতে সহায়তা করে এবং প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ সরবরাহ করে।
আয়রনসমৃদ্ধ খাবার: কলিজা, কচুশাক, ডিম, ডাল, খেজুর ও কিশমিশের মতো আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। বিশেষ করে ঋতুস্রাব শুরু হওয়া কিশোরীদের জন্য পর্যাপ্ত আয়রন গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি: দুধ, দই, পনির এবং কাঁটাসহ খাওয়া যায় এমন ছোট মাছ ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস। হাড় ও দাঁতের স্বাভাবিক গঠনের জন্য পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি প্রয়োজন।
তাজা ফল: প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় মৌসুমি তাজা ফল রাখা উচিত। এতে থাকা ভিটামিন, খনিজ ও ফাইবার শরীরের পুষ্টির চাহিদা পূরণে সহায়তা করে।
যেসব খাবার কমানো ভালো
বয়ঃসন্ধিকালে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার কম খাওয়া উচিত। কোমল পানীয়, অতিরিক্ত চকলেট, আইসক্রিম, ভাজাপোড়া ও অন্যান্য অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়মিত না খাওয়াই ভালো।
দ্রুত ওজন বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে ফাস্টফুড, কেক ও পেস্ট্রির মতো উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবারও সীমিত করা প্রয়োজন। শুধু ওজন নিয়ন্ত্রণ নয়, সামগ্রিক সুস্বাস্থ্যের জন্যও সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
খাবারের পাশাপাশি মানসিক যত্নও জরুরি
বয়ঃসন্ধিকাল শুধু শারীরিক পরিবর্তনের সময় নয়, এ সময় মানসিকভাবেও নানা পরিবর্তন আসে। তাই পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম, বিশ্রাম এবং শারীরিক কার্যক্রমের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের উচিত কিশোর-কিশোরীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করা।
তাদের বিভিন্ন সমস্যা ও অনুভূতি নিয়ে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। পরিবারের কাছ থেকে সহযোগিতা ও মানসিক সমর্থন পেলে এই পরিবর্তনশীল সময়টি তারা আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পার করতে পারে। পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর খাবার ও নিজের যত্ন নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে ভবিষ্যৎ জীবনেও এর সুফল পাওয়া যায়।

