রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

যেসব বিষয় নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা নিষিদ্ধ

নিউজ ডেস্ক

আল্লাহ তাআলা মানুষকে পরম মমতায় সৃষ্টি করেছেন এবং সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সম্মানিত করেছেন। মানুষের আত্মসম্মান, মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা করা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। কিন্তু বর্তমান সমাজে নিছক বিনোদন কিংবা হাসি-ঠাট্টার নামে অন্যকে নিয়ে উপহাস, বিদ্রূপ ও কটূক্তি করার প্রবণতা বাড়ছে। অনেক সময় সামান্য একটি কথাও অন্যের মনে গভীর আঘাত তৈরি করতে পারে।

ইসলাম বৈধ ও শালীন রসিকতাকে নিষিদ্ধ করেনি। তবে যে কৌতুকের মাধ্যমে কারও মনে কষ্ট দেওয়া হয়, অপমান করা হয় কিংবা শরিয়তের কোনো সীমা লঙ্ঘন করা হয়, তা থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

পবিত্র কোরআনে মানুষের মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ

‘আর আমি তো আদমসন্তানকে সম্মানিত করেছি এবং স্থলে ও সমুদ্রে তাদের চলাচলের ব্যবস্থা করেছি।’
(সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ৭০)

অন্যদিকে মানুষকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপের বিষয়ে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِّن قَوْمٍ عَسَىٰ أَن يَكُونُوا خَيْرًا مِّنْهُمْ وَلَا نِسَاءٌ مِّن نِّسَاءٍ عَسَىٰ أَن يَكُونَّ خَيْرًا مِّنْهُنَّ

‘হে মুমিনগণ, কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রূপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর নারীরাও যেন অন্য নারীদের ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রূপকারীদের চেয়ে উত্তম।’
(সুরা আল-হুজুরাত: আয়াত ১১)

যেসব বিষয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ থেকে বিরত থাকতে হবে

১. দ্বীন ও ধর্মীয় বিষয় নিয়ে উপহাস

আল্লাহ, পবিত্র কোরআন, রাসুলুল্লাহ (সা.), সুন্নাহ কিংবা ইসলামের কোনো বিধান নিয়ে বিদ্রূপ বা উপহাস করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। পবিত্র কোরআনে এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে—

وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ ۚ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ ۝ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ

‘আর তুমি যদি তাদের জিজ্ঞাসা কর, তবে তারা অবশ্যই বলবে, আমরা তো কেবল আলাপ-আলোচনা ও খেলাধুলা (রসিকতা) করছিলাম। বল, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসুলকে নিয়ে ঠাট্টা করছিলে? তোমরা অজুহাত পেশ করো না, তোমরা তো ইমান আনার পর কুফরি করেছ।’
(সুরা আত-তওবা: আয়াত ৬৫-৬৬)

২. কারও শারীরিক গঠন বা ত্রুটি নিয়ে হাসাহাসি

কারও উচ্চতা, গায়ের রং, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, খাটো হওয়া কিংবা অন্য কোনো শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে কৌতুক করা ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়। এতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মানসিকভাবে গভীরভাবে আঘাত পেতে পারেন।

হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি একবার হজরত সাফিয়া (রা.)-এর খাটো হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করেছিলেন। তা দেখে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিষয়টি অপছন্দ করেন এবং বলেন—

لَقَدْ قُلْتِ كَلِمَةً لَوْ مُزِجَتْ بِمَاءِ الْبَحْرِ لَمَزَجَتْهُ

‘তুমি এমন একটি কথা বলেছ, তা যদি সমুদ্রের পানির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হতো, তবে তা সমুদ্রের পানিকেও প্রভাবিত করত।’
(তিরমিজি: ২৫০২)

৩. বিকৃত বা অপছন্দনীয় নামে ডাকা

কারও নাম বিকৃত করা কিংবা তাকে এমন কোনো উপাধিতে ডাকা, যা সে অপছন্দ করে—সমাজে এমন প্রবণতা দেখা যায়। অথচ পবিত্র কোরআনে এ ধরনের আচরণ থেকে স্পষ্টভাবে নিষেধ করা হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَلَا تَلْمِزُوا أَنفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ ۖ بِئْسَ الِاسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيمَانِ ۚ وَمَن لَّمْ يَتُبْ فَأُولَٰئِك هُمُ الظَّالِمُونَ

‘তোমরা একে অপরের নিন্দা করো না এবং একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। ইমান আনার পর মন্দ নামে ডাকা কতই না নিকৃষ্ট! আর যারা তওবা না করে, তারাই তো জালিম।’
(সুরা আল-হুজুরাত: আয়াত ১১)

৪. কারও ভুল, বিপদ বা অতীতের গুনাহ নিয়ে খোঁটা দেওয়া

মানুষ মাত্রই ভুল করতে পারে এবং জীবনে নানা ধরনের বিপদের মুখোমুখি হতে পারে। কারও ব্যর্থতা, বিপদ কিংবা অতীতের সংশোধিত ভুল নিয়ে হাসাহাসি করা বা তাকে খোঁটা দেওয়া ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী।

রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন—

لاَ تُظْهِرِ الشَّمَاتَةَ لأَخِيكَ فَيَرْحَمَهُ اللَّهُ وَيَبْتَلِيَكَ

‘তুমি তোমার ভাইয়ের বিপদে আনন্দ প্রকাশ করো না। তা করলে আল্লাহ তার ওপর দয়া করবেন এবং তোমাকে সেই বিপদে আক্রান্ত করতে পারেন।’
(তিরমিজি: ২৫০৬)

৫. দারিদ্র্য ও আর্থিক অবস্থা নিয়ে উপহাস

কারও পুরোনো বা ছেঁড়া পোশাক, কম দামি জিনিসপত্র, সাধারণ জীবনযাপন কিংবা আর্থিক দুরবস্থা নিয়ে ঠাট্টা করা অনুচিত। ইসলামে মানুষের মর্যাদা সম্পদ বা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

بِحَسْبِ امْرِئٍ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ

‘কোনো মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ মনে করে।’
(মুসলিম: ২৫৬৪)

রসিকতায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ

ইসলাম মানুষের জীবনকে আনন্দহীন বা নিরস করে দেয়নি। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের সঙ্গে রসিকতা ও আনন্দ-কৌতুক করতেন। তবে তাঁর রসিকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—তাতে মিথ্যা, অন্যায় কিংবা কাউকে অপমান করার বিষয় থাকত না।

হাদিসে এসেছে, সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আপনিও কি আমাদের সঙ্গে কৌতুক করেন?’ তিনি বলেন—

إِنِّي لاَ أَقُولُ إِلاَّ حَقًّا

‘হ্যাঁ, তবে আমি সত্য ছাড়া অন্য কিছু বলি না।’
(তিরমিজি: ১৯৯০)

হাসি-ঠাট্টা মানুষের জীবনে আনন্দ এনে দিতে পারে। তবে সেই রসিকতা যখন অন্যের আত্মসম্মানে আঘাত করে, কাউকে হেয় করে কিংবা দ্বীনের সীমা লঙ্ঘন করে, তখন তা আর নিছক বিনোদন থাকে না।

তাই অন্যের শারীরিক বৈশিষ্ট্য, দারিদ্র্য, ভুলত্রুটি, বিপদ কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে উপহাস করা থেকে জবানকে সংযত রাখা জরুরি। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করে সত্য, শালীনতা ও পারস্পরিক সম্মানের সীমার মধ্যে থেকে আনন্দ ভাগ করে নেওয়াই হওয়া উচিত একজন সচেতন মুমিনের আচরণ।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন