র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে এর পরিবর্তে পুলিশের অধীনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বিলটি উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। প্রস্তাবিত আইনের মাধ্যমে র্যাব গঠনের বিদ্যমান আইনি বিধান বাতিল করে পুলিশের অধীনে নতুন এই বিশেষায়িত ইউনিট প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে।
তবে বিলটি উত্থাপনের বিষয়ে আপত্তি জানান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. মো. শফিকুর রহমান এবং বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, র্যাব নামে কোনো সংস্থা থাকবে না—এটি সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিটের প্রয়োজনীয়তা থাকায় সেই প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এসআরবি গঠনের বিল আনা হয়েছে।
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার কারণে পুরো পুলিশ বাহিনী বিলুপ্ত করা যায় না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রস্তাবিত এসআরবিতে র্যাবের তুলনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য আরও শক্তিশালী বিধান রাখা হয়েছে। তিনি বিরোধীদলীয় আইনপ্রণেতাদের বিলটি সংসদীয় কমিটিতে যাচাই-বাছাইয়ের সময় নিজেদের মতামত ও সুপারিশ দেওয়ার আহ্বান জানান।
যেসব সম্পদ এসআরবিতে যাবে
বিলে র্যাবের জনবল, আদেশ, ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের পাশাপাশি সুযোগ-সুবিধা, তহবিল, নগদ অর্থ, ব্যাংক আমানত, দায়-দেনা ও চুক্তি এসআরবিতে হস্তান্তরের বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে র্যাবের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, রেজিস্টার ও নথিপত্রও নতুন ইউনিটের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তাব রয়েছে।
প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, এসআরবি পুলিশের অধীনে একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। সরকারি প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ সদস্য, অন্যান্য বাহিনীর সদস্য এবং নির্ধারিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদায়ন বা প্রেষণের মাধ্যমে ইউনিটটি গঠন করা হবে।
এসআরবির জন্য নির্ধারিত পতাকা, প্রতীক ও ইউনিফর্ম থাকবে। ইউনিটটির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন একজন কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তা। তার পদমর্যাদা অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শকের (অতিরিক্ত আইজিপি) নিচে হবে না।
থাকবে তদন্ত ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা
প্রস্তাবিত আইনে এসআরবিকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের পাশাপাশি তল্লাশি, গ্রেপ্তার এবং মালামাল বা আলামত জব্দের ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। জব্দ করা মালামাল সংরক্ষণের জন্য ইউনিটটির নিজস্ব মালখানা বা সংরক্ষণ ব্যবস্থাও থাকবে।
নাগরিকদের অভিযোগ এবং ইউনিটের সদস্যদের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একাধিক সদস্যের সমন্বয়ে ‘অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব রয়েছে।
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধসহ গুরুতর অপরাধ প্রতিরোধ ও দমন এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা করতেই নতুন ইউনিটটি গঠন করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে এসআরবির ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইনের শাসন, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা, কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টিও প্রস্তাবিত আইনে রাখা হয়েছে।
পরে বিলটি যাচাই-বাছাই করে চার কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।
এপিবিএনের জন্যও নতুন আইন
এদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল, ২০২৬’ সংসদে উত্থাপন করেন। বিদ্যমান অধ্যাদেশ বাতিল করে এপিবিএনের জন্য নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করাই এ বিলের উদ্দেশ্য।
প্রস্তাবিত আইনে পুলিশের অধীনে এপিবিএনের বিভিন্ন ইউনিটের কার্যক্রমের বিধান রাখা হয়েছে। এর মধ্যে স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রোটেকশন ব্যাটালিয়ন, হিল ব্যাটালিয়ন, এয়ারপোর্ট ব্যাটালিয়নসহ সরকার নির্ধারিত অন্যান্য ব্যাটালিয়ন অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
নতুন আইনে এপিবিএনকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি ফৌজদারি কার্যবিধি ও অন্যান্য প্রচলিত আইনের অধীনে কোনো স্থাপনায় প্রবেশ, তল্লাশি, সম্পত্তি জব্দ এবং গ্রেপ্তারের ক্ষমতাও তাদের দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এপিবিএন সদস্যদের জন্য শৃঙ্খলা ও আচরণবিধির বিষয়েও বিধান রাখা হয়েছে। সাধারণভাবে কোনো সংগঠনের সদস্য হওয়া বা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া নিষিদ্ধ থাকবে। তবে পেশাগত উন্নয়ন কিংবা এপিবিএনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট পেশাজীবী সংগঠনের সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে অনুমতির সুযোগ থাকবে।
এ ছাড়া উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া ইলেকট্রনিক মাধ্যম বা সংবাদপত্রে কোনো তথ্য কিংবা নথি প্রকাশ করা বা প্রকাশে সহায়তা করা থেকে এপিবিএন সদস্যদের বিরত থাকতে হবে।
এ বিলটিও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।

