সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
Logo

হাজার বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হতে পারে এল নিনো

নিউজ ডেস্ক

চলতি বছরের শেষ দিকে এল নিনো আরও শক্তিশালী হয়ে গত চার দশকের পর্যবেক্ষণ রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। সংস্থাটি জানিয়েছে, শক্তিশালী এই জলবায়ু প্রবাহের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় পরিবর্তন ঘটতে পারে। বাড়তে পারে বন্যা, খরা ও চরম দাবদাহের ঝুঁকিও।

ডব্লিউএমওর সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, এল নিনো ইতোমধ্যে সুদৃঢ় হয়েছে এবং আগামী মাসগুলোতে এটি আরও তীব্র হয়ে ‘খুব শক্তিশালী’ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। ২০২৬ সালের শেষ দিকে এর সর্বোচ্চ তীব্রতা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত এল নিনো স্থায়ী থাকার সম্ভাবনা প্রায় ১০০ শতাংশ।

ডব্লিউএমও মহাসচিব সেলেস্টে সাউলো বলেন, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এল নিনো সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ শুরুর পর গত চার দশকে দেখা যেকোনো ঘটনার চেয়েও শক্তিশালী হতে পারে। এমনকি এতটাই তীব্র হতে পারে যে, অতীতের ব্যবহৃত চার্টের মাত্রাও ছাড়িয়ে যাবে।

কী এই এল নিনো

এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত প্রক্রিয়া, যার সময় মধ্য ও পূর্ব বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার স্বাভাবিক ধরনে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

ডব্লিউএমও জানিয়েছে, মধ্য ও পূর্ব বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। মে থেকে জুলাই ২০২৬ সময়ে সংশ্লিষ্ট সূচকে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে গড়ে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। জুলাইয়ের শেষ থেকে আগস্টের মাঝামাঝি সাপ্তাহিক পরিমাপে এই ব্যবধান বেড়ে প্রায় ২ দশমিক ২ থেকে ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়।

সমুদ্রের নিচেও অস্বাভাবিক উষ্ণতা দেখা গেছে। জুলাই ও আগস্টের শুরুতে প্রশান্ত মহাসাগরের কিছু এলাকায় ভূগর্ভস্থ সমুদ্রপানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি ছিল। এই বিপুল পরিমাণ উষ্ণ পানি এল নিনোর তীব্রতা আরও বাড়াতে পারে বলে জানিয়েছে ডব্লিউএমও।

বাড়বে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি

শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যা দেখা দিতে পারে, আবার কোথাও খরা আরও তীব্র হতে পারে। একই সঙ্গে বাড়তে পারে অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও দাবদাহের ঝুঁকি।

ডব্লিউএমওর সেপ্টেম্বর-নভেম্বর ২০২৬ পূর্বাভাসে বিশ্বের প্রায় সব স্থলভাগেই স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রার সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। শক্তিশালী প্রশান্ত মহাসাগরীয় এল নিনোর কারণে বৃষ্টিপাতের ধরনেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের আশঙ্কা রয়েছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, পৃথিবী এখন চরম আবহাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক তাপমাত্রাও ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে।

অর্থনীতি ও জীবিকায় প্রভাব

ডব্লিউএমওর মহাসচিব সেলেস্টে সাউলো বলেছেন, এই ব্যতিক্রমী এল নিনো বিশ্বের বিভিন্ন সম্প্রদায় ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত হানতে পারে। কৃষি, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, পানি, পরিবহন, মৎস্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ জলবায়ু-সংবেদনশীল বিভিন্ন খাত এতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

সংস্থাটি ইতোমধ্যে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে কৃষি, স্বাস্থ্য, পানি ও জ্বালানি খাত এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

২০২৪ সালের রেকর্ডও ভাঙতে পারে

এর আগে ২০২৩-২৪ সালের শক্তিশালী এল নিনো বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। ওই সময়ের প্রভাবেই ২০২৪ সাল রেকর্ডের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে নথিভুক্ত হয়। ডব্লিউএমও জানিয়েছে, বর্তমান এল নিনোর তীব্রতা আরও বাড়লে বৈশ্বিক তাপমাত্রার সেই রেকর্ডও ভেঙে যেতে পারে।

তবে ডব্লিউএমও স্পষ্ট করেছে, কোনো অঞ্চলে এল নিনোর প্রভাব কতটা তীব্র হবে, তা শুধু এল নিনোর শক্তির ওপর নির্ভর করে না। অঞ্চল ও মৌসুমভেদে এর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে এবং ভারত ও আটলান্টিক মহাসাগরের পরিস্থিতিসহ অন্যান্য জলবায়ুগত প্রভাবকও এতে ভূমিকা রাখতে পারে।

সাধারণত এল নিনো কয়েক বছর পরপর ফিরে আসে এবং কয়েক মাস থেকে প্রায় এক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তবে এবারের ঘটনায় এর সম্ভাব্য তীব্রতা এবং ২০২৭ সাল পর্যন্ত প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কায় আগাম প্রস্তুতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে জাতিসংঘের আবহাওয়া সংস্থা।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন