রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

‘চিকেনস নেকে’ ২ হাজার কোটি রুপি খরচে নতুন মহাসড়ক বানাচ্ছে ভারত

নিউজ ডেস্ক

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে দেশটির মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’-এ নতুন চার লেনের মহাসড়ক নির্মাণে ২ হাজার ৭৭ কোটি ১৮ লাখ রুপি বরাদ্দ দিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই করিডোরে ৩১ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়কটি বিদ্যমান জাতীয় মহাসড়ক-২৭-এর (এনএইচ২৭) সমান্তরালে নির্মাণ করা হবে।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে ভারতের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়কমন্ত্রী নিতিন গড়করি এ তথ্য জানান। নতুন মহাসড়কটি পশ্চিমবঙ্গের বাগডোগরা থেকে বিহারের গলগালিয়া পর্যন্ত পানিটাঙ্কি ও খড়িবাড়ি হয়ে যাবে। এর নাম দেওয়া হয়েছে জাতীয় মহাসড়ক-৩২৭ (এনএইচ৩২৭)।

প্রকল্প অনুযায়ী, এনএইচ৩২৭ সড়কটি এনএইচ২৭ থেকে প্রায় ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরত্ব বজায় রেখে নির্মাণ করা হবে। এতে শিলিগুড়ি করিডোরের ওপর বিদ্যমান সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি বিকল্প একটি পথ তৈরি হবে।

‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত শিলিগুড়ি করিডোরটি প্রায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ। এর সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ মাত্র ২০ থেকে ২২ কিলোমিটার। নেপাল ও বাংলাদেশের মাঝখানে অবস্থিত এই ভূখণ্ড ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে দেশটির মূল অংশের স্থল যোগাযোগের প্রধান পথ। চীন ও ভুটান সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় করিডোরটির কৌশলগত গুরুত্বও অনেক বেশি।

গড়করি বলেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই করিডোরে নতুন সড়ক নির্মাণের ফলে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের দিকে যাতায়াত ব্যবস্থাও উন্নত হবে।

তিনি বলেন, চার লেনের মহাসড়ক চালু হলে বাগডোগরা, নকশালবাড়ি, খড়িবাড়ি ও পানিটাঙ্কি এলাকায় যানজট কমবে। পাশাপাশি বাগডোগরা বিমানবন্দর ও অন্যান্য আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়বে। কৃষি, চা, উদ্যানজাত পণ্যসহ স্থানীয় বিভিন্ন পণ্য দ্রুত বড় বাজারে পরিবহনের সুযোগও তৈরি হবে।

প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ দুই প্রান্ত হলো বিহারের কিষানগঞ্জ জেলার গলগালিয়া এবং দার্জিলিং জেলার শিলিগুড়ি মহকুমার পানিটাঙ্কি। নেপালের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য পানিটাঙ্কি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট রুট।

মহাসড়ক নির্মাণের আওতায় তিনটি বড় সেতু, একটি রোড ওভারব্রিজ, পাঁচটি হাতি চলাচলের আন্ডারপাস এবং সড়কের দুই পাশে সার্ভিস রোড নির্মাণ করা হবে।

ভারতের অবকাঠামো পরিকল্পনায় শিলিগুড়ি করিডোরকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর করিডোরটির নিরাপত্তা ও যোগাযোগ অবকাঠামো জোরদারে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের তৎপরতা আরও বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এরই মধ্যে বারাণসী থেকে নিউ জলপাইগুড়ি পর্যন্ত দ্রুতগতির রেল করিডোর নির্মাণের ঘোষণা এসেছে। শিলিগুড়ির কাছে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি মালদা থেকে নিউ জলপাইগুড়ি পর্যন্ত চতুর্থ রেললাইন স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে ভারতীয় রেল মন্ত্রণালয়।

এক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা দ্য টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়াকে বলেন, এনএইচ২৭ শিলিগুড়ি ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে ভারতের মূল ভূখণ্ডের অন্যতম প্রধান সড়ক যোগাযোগ। এখন গলগালিয়া থেকে শিলিগুড়ি করিডোর হয়ে দ্বিতীয় একটি সমান্তরাল মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর পেছনে কৌশলগত কারণও থাকতে পারে।

এদিকে বাগডোগরা বিমানবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নেও কাজ করছে ভারত সরকার। আলিপুরদুয়ারের হাসিমারা থেকে বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। হাসিমারা বিমানঘাঁটিতে ভারতের রাফাল যুদ্ধবিমানের একটি স্কোয়াড্রন মোতায়েন রয়েছে।

নতুন মহাসড়কের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো হাতি চলাচলের জন্য পাঁচটি আন্ডারপাস নির্মাণ। এনএইচ৩২৭-এর যে অংশ কার্শিয়াং বন বিভাগের মধ্য দিয়ে যাবে, সেখানে কয়েকটি এলাকাকে হাতি চলাচলের অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বন বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ধান কাটার মৌসুমে ওই এলাকাগুলোতে হাতির চলাচল বেড়ে যায়। আন্ডারপাসগুলো নির্মিত হলে দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষে হাতি আহত বা নিহত হওয়ার ঝুঁকি কমবে।

দার্জিলিংয়ের বিজেপি সাংসদ রাজু বিস্তাও প্রকল্পটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর মতে, শিলিগুড়ি করিডোরের কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় এই মহাসড়ক শুধু যোগাযোগব্যবস্থাই উন্নত করবে না, উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক অবকাঠামোও শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে ভারতের পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মধ্যে মানুষ, পণ্য ও সেবার চলাচল আরও সহজ হবে।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন