সংকটে পড়া ব্যাংকের পুরোনো শেয়ারধারীদের শর্তসাপেক্ষে পুনরায় ওই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় নেওয়ার সুযোগ দেওয়া সংক্রান্ত ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ১৮(ক) ধারা বাতিলে সায় দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির বৈঠকে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ নিয়ে আলোচনা শেষে বিলটি সংশোধিত আকারে সংসদে পাসের সুপারিশ করা হয়। সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বৈঠকে বিলটি পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনা করা হয়। পরে সংশোধিত আকারে এটি সংসদে পাসের সুপারিশ করে কমিটি।
২০২৫ সালে সংকটে পড়া ব্যাংক পুনর্গঠন বা একীভূত করার আইনি কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ জারি করেছিল। ওই অধ্যাদেশে ১৮(ক) ধারা ছিল না। পরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে অধ্যাদেশটি আইনে রূপ দেওয়ার সময় নতুন করে ধারাটি যুক্ত করা হয়।
১৮(ক) ধারায় নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ সাপেক্ষে রেজল্যুশন বা পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যাংকের পুরোনো শেয়ারধারীদের পুনরায় শেয়ার, সম্পদ ও দায় নেওয়ার আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছিল। এ ধারা নিয়ে সংসদের বিরোধী দল আপত্তি জানায় এবং সংসদের বাইরেও এর সমালোচনা হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১০ আগস্ট মন্ত্রিসভা ১৮(ক) ধারা বাতিলের প্রস্তাবে অনুমোদন দেয়। সেই সংশোধনী বিল নিয়েই শনিবার সংসদীয় কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠক শেষে সংসদ ভবনের টানেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ঢাকা-১২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, ১৮(ক) ধারা বাতিলের বিষয়ে বিরোধী দলের কোনো আপত্তি নেই। বরং শুরু থেকেই তারা ধারাটি বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছেন।
তবে শুধু ১৮(ক) ধারা বাতিল নয়, পুরো ব্যাংক রেজল্যুশন আইন পুনরায় পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলেও বৈঠকে প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
সাইফুল আলম বলেন, একীভূত করা পাঁচটি ব্যাংকের সম্পদ ও দায় যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন ছিল। আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী, এ ধরনের একীভূতকরণের আগে স্বাধীন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সম্পদ ও দায় মূল্যায়ন করা উচিত।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার আগে এ ধরনের মূল্যায়ন করা হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, সম্পদ ও দায় যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করলে কোন ব্যাংকের সঙ্গে কী একীভূত করা হচ্ছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না। সুযোগ থাকলে এখনো ওই মূল্যায়ন করা উচিত।
এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর ব্যাংকটিকে চূড়ান্ত লাইসেন্স দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
একীভূত হওয়ার আগে এক্সিম ব্যাংকের পর্ষদ ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। অন্য চার ব্যাংকের পর্ষদে এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম ও তার পরিবারের নিয়ন্ত্রণ ছিল। ফলে পুরোনো শেয়ারধারীদের পুনরায় ফিরে আসার সুযোগ রাখা ১৮(ক) ধারা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
গত ১৬ আগস্ট পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসক প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক একক ব্যবস্থাপনায় কার্যক্রম শুরু করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মার্চের তথ্য অনুযায়ী, একীভূত পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের ৮৪ দশমিক ২২ শতাংশ। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ারে রূপান্তরের মাধ্যমে মূলধনে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমান। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, মঈনুল ইসলাম খান, শাহাদাত হোসেন ও সৈয়দ জয়নুল আবেদীনসহ সংশ্লিষ্ট সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

