রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

জালিয়াতির জাল বুনে খালেকুজ্জামানের রাজত্ব

নিউজ ডেস্ক

বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার কমিশন, পদোন্নতিতে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন ও সনদ জালিয়াতিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে বদলি-পদায়ন ও বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করছেন।

বিশেষ করে উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের বদলিতে লটারি প্রক্রিয়া নিয়ে স্বজনপ্রীতি, বৈষম্য ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের একাংশের দাবি, লটারি শুরুর আগেই পছন্দের কর্মকর্তাদের নাম নির্দিষ্ট বাক্সে রাখা হয়। পরে তাদের গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়ন দেওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগে সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছেন কয়েকজন প্রকৌশলী।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী উপসহকারী প্রকৌশলী থেকে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পর্যন্ত নিজ জেলা বাদ দিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক বিভাগের মধ্যে লটারির মাধ্যমে বদলির কথা। কোনো বিভাগে কর্মকর্তা বেশি হলে অতিরিক্ত কর্মকর্তাদের তুলনামূলক কম কর্মকর্তা থাকা বিভাগে দেওয়ার বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা থেকে ঢাকায় পদায়ন এড়িয়ে চলার কথা বলা হয়েছে।

তবে অভিযোগ রয়েছে, ‘অতিরিক্ত কর্মকর্তা’ দেখিয়ে আগে থেকেই নির্দিষ্ট কিছু প্রকৌশলীর নাম ঢাকা জেলার লটারির বাক্সে রাখা হয়। পরে ওই বাক্স থেকে নাম তুলে তাদের ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়ন করা হয়েছে। অভিযোগকারী এক প্রকৌশলীর দাবি, পছন্দের কর্মস্থল নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়া হয়েছে।

লটারিতে স্বজনপ্রীতি ও বৈষম্যের অভিযোগ

বদলি প্রক্রিয়ায় ঢাকা বিভাগের জন্য ‘ঢাকা জেলা’ ও ‘ঢাকা বিভাগ’ নামে দুটি লটারির বাক্স রাখা হয়েছিল। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, ঢাকা জেলার বাক্সে শুধু সংশ্লিষ্ট যোগ্য কর্মকর্তাদের নাম থাকার কথা থাকলেও দেশের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের নাম সেখানে কীভাবে যুক্ত হলো।

তাদের দাবি, লটারির আগে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সিভিলের ঢাকা জেলার বাক্সে ৪১ জনের নাম যুক্ত করা হয়। এ ছাড়া তিনজন সিভিল ও চারজন ই/এম বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলীসহ সাতজনকে লটারির আওতায় না আনার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগকারীরা কয়েকজন প্রকৌশলীর বদলি-পদায়নের উদাহরণ তুলে ধরে দাবি করেছেন, কেউ দীর্ঘদিন ঢাকার বাইরে থাকার পর ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন, আবার কেউ নিজ জেলা বা ঢাকার বাইরে থাকার নিয়ম থাকা সত্ত্বেও ঢাকায় পদায়ন পেয়েছেন। বিপরীতে কয়েকজন প্রকৌশলীকে মাত্র কয়েক মাস আগে বদলি হওয়ার পর আবারও ঢাকার বাইরে পাঠানো হয়েছে।

এ নিয়ে প্রকৌশলীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

৬৫ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ

গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের অন্তত ৬৫ প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাকে পছন্দের কর্মস্থলে বদলি বা পদায়নের সুযোগ করে দিতে ১০ লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব লেনদেনের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে পরিচিত কিছু কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

চলতি বছরের ৩ মার্চ পৃথক কয়েকটি প্রজ্ঞাপনে এক দিনেই গণপূর্ত অধিদপ্তরের অর্ধশতাধিক নির্বাহী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়। এত বড় পরিসরে বদলির আগে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

পরে বিষয়টি নিয়ে প্রধান প্রকৌশলীকে তলব করে গণপূর্তমন্ত্রী ব্যাখ্যা চান বলে জানা গেছে। ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হওয়ায় ৫ ও ৮ মার্চ পৃথক আদেশে আগের গণবদলির অধিকাংশ বাতিল করা হয়।

তবে এরপরও ছোট পরিসরে বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার অভিযোগ রয়েছে।

৫ আগস্টের পর প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব

অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের ডিঙিয়ে মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব নেন। এরপর নিজের পছন্দের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন তিনি।

অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বদলি-পদায়ন, পদোন্নতি, টেন্ডার কমিশন এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে কাজ পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। সিন্ডিকেটে সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান, ঢাকা সার্কেল-১ থেকে বদলিকৃত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলম খান এবং ঢাকা সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরীর নাম এসেছে।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ভুয়া পিএইচডি সনদ ব্যবহারের অভিযোগ

মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ভুয়া পিএইচডি সনদ ব্যবহার করে উচ্চশিক্ষার ছুটি ও প্রেষণ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নথির বরাতে দাবি করা হয়েছে, বিভাগীয় তদন্তে জালিয়াতি ও অসদাচরণের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ার পর তিনি দোষ স্বীকার করেন। পরে তার বিরুদ্ধে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর কয়েক বছরের মধ্যে তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান।

এ ছাড়া ১৯৮৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চাকরিজীবনে সরকারি প্রেষণ ও ছুটির সুযোগে তিনি প্রায় ১১ বছর অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের ডিঙিয়ে পদ পাওয়ার অভিযোগ

মন্ত্রণালয়ের নথির বরাতে আরও দাবি করা হয়েছে, প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার জন্য প্রস্তুত করা সংক্ষিপ্ত তালিকায় জ্যেষ্ঠতার ক্রমের বাইরে নিজের নাম ওপরে রাখেন খালেকুজ্জামান। একই সময়ে তার চেয়ে জ্যেষ্ঠ কয়েকজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে জুলাই গণহত্যা-সংক্রান্ত মামলার তথ্য সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডে (এসএসবি) পাঠানো হয়।

কয়েকজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীর অভিযোগ, তাদের প্রতিযোগী হিসেবে বিবেচনা করে মামলা ও মামলার নথি ব্যবহার করে পদোন্নতির পথ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। একটি মামলায় ৪৭ প্রকৌশলীর নাম যুক্ত করার অভিযোগও তারা করেছেন।

তবে এসব মামলার অভিযোগ ও এর সঙ্গে পদোন্নতি প্রক্রিয়ার সম্পর্কের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ভিন্ন হতে পারে এবং অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা বিচারিক বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হওয়ার বিষয়।

গ্রিন কোজি কটেজের নকশা অনুমোদনেও নাম

২০২৪ সালের বেইলি রোডের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে গ্রিন কোজি কটেজে ৪৬ জনের মৃত্যু হয়। ওই ভবনের নকশা অনুমোদন নিয়েও পরে প্রশ্ন ওঠে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্যের বরাতে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০১১ সালে ভবনটির নকশা অনুমোদনের সঙ্গে তৎকালীন রাজউকের অথরাইজড অফিসার হিসেবে মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর নাম ছিল। অগ্নিকাণ্ডের পর ভবনটির অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।

এরপর ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পান খালেকুজ্জামান।

অভিযোগ অস্বীকার প্রধান প্রকৌশলীর

এসব অভিযোগের বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের বদলিতে কোনো অনিয়ম হয়নি এবং বিষয়টি মন্ত্রণালয় অবগত আছে।

নির্বাহী প্রকৌশলীদের লটারির মাধ্যমে বদলি করা হবে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ নির্বাহী প্রকৌশলীরা। তাদের লটারির মাধ্যমে নয়, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বদলি করা হবে।

জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের প্রতিযোগী মনে করে তাদের বিরুদ্ধে মামলার নথি মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, তার কোনো প্রতিযোগী নেই।

‘অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’: সচিব

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের বদলিতে অনিয়ম হয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি করা হবে না—এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব প্রধান প্রকৌশলীকে দেওয়া হয়নি।

প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার দৌড়ে থাকা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা ও হয়রানির অভিযোগ প্রসঙ্গে সচিব বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরে কর্মকর্তারা একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন এবং বিষয়টি তারা পর্যবেক্ষণ করছেন।

তিনি জানান, তালিকা অনুযায়ী খালেকুজ্জামান তিন নম্বরে রয়েছেন এবং তার চেয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়েছেন। প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়োগের জন্য গ্রেড-১ হওয়ার যোগ্যতা যাচাই-বাছাই করতে বিষয়টি এসএসবিতে পাঠানো হয়েছে। তালিকা ও যাচাই-বাছাই শেষে যিনি যোগ্য বিবেচিত হবেন, তাকেই প্রধান প্রকৌশলী করা হবে।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন