মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
Logo

টাকা গেল, এলো না কপ্টার

নিউজ ডেস্ক

পুলিশ বাহিনীর জরুরি ব্যবহারের জন্য রাশিয়া থেকে ৫৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা দুটি হেলিকপ্টারের একটিও এখন পর্যন্ত বুঝে পায়নি বাংলাদেশ। জি-টু-জি পদ্ধতিতে করা ওই চুক্তির আওতায় ইতোমধ্যে তিন অর্থবছরে প্রায় ৪২৮ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্রয়মূল্যের ৪ শতাংশ হারে মধ্যস্থতাকারীকে প্রায় ১৭ কোটি টাকা কমিশন দেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, রাশিয়ার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ধাপে ধাপে অর্থ পরিশোধ করা হয়। নিষেধাজ্ঞার কারণে হেলিকপ্টার দুটি গ্রহণ করলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে প্রভাব পড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় আপাতত সেগুলো না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নিষেধাজ্ঞা কবে উঠবে কিংবা বাংলাদেশ কবে হেলিকপ্টার দুটি পাবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।

২০২১ সালে চুক্তি, ব্যয় ৫৫৬ কোটি

২০২১ সালের ১৯ নভেম্বর রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জেএসসি হেলিকপ্টার্সের কাছ থেকে ‘এমআই১৭১এ২’ মডেলের দুটি হেলিকপ্টার কেনার চুক্তি করে বাংলাদেশ সরকার। দরপত্র ছাড়াই জি-টু-জি পদ্ধতিতে করা ওই চুক্তির মোট মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৫৫৬ কোটি টাকা।

চুক্তি অনুযায়ী ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিন অর্থবছরে হেলিকপ্টারের মোট মূল্যের ৭০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৪২৮ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হেলিকপ্টার দুটি সরবরাহ করার কথা থাকলেও তা হয়নি।

নিষেধাজ্ঞার পরও চলেছে অর্থ পরিশোধ

রুশ প্রতিষ্ঠানটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় ২০২২ সালের শুরুর দিকে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি জানার পরও ২০২৪ সাল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।

এরপর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়। তখনই বিষয়টি নিয়ে সরকারের মধ্যে নড়াচড়া শুরু হয়।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ১৫ থেকে ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত আট কর্মকর্তা রাশিয়ায় গিয়ে হেলিকপ্টার দুটির প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন (পিএসআই) করেন। তবে পরবর্তী সময়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে হেলিকপ্টার গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পিএসআইয়ের জন্য কর্মকর্তাদের রাশিয়া যেতে হয়েছিল। যেহেতু এটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি ছিল, তাই নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ওই পরিদর্শন করা হয়।

একটি হেলিকপ্টার প্রস্তুতও করেছিল রাশিয়া

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার সামরিক ও যুদ্ধাস্ত্র সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

চুক্তি অনুযায়ী ২০২৪ সালের মধ্যেই হেলিকপ্টার দুটি বাংলাদেশকে দেওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে একটি হেলিকপ্টার ২০২৪ সালের এপ্রিলে এবং অপরটি পরবর্তী সময়ে সরবরাহের কথা ছিল। এমনকি ২০২৫ সালের ১৭ জানুয়ারি একটি হেলিকপ্টার সরবরাহের জন্য প্রস্তুতও করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বাংলাদেশ সেটি গ্রহণ করেনি।

মধ্যস্থতাকারীকে ১৭ কোটি টাকা কমিশন

জি-টু-জি পদ্ধতিতে চুক্তি হলেও এর মধ্যস্থতাকারী সৈয়দ আহসান আহমেদ সায়মুমকে ক্রয়মূল্যের ৪ শতাংশ হারে ১৭ কোটি ১২ লাখ টাকা কমিশন দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্ব পালন করা এক কর্মকর্তা।

ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, সায়মুম তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের ক্যাশিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।

এদিকে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি জানার পরও অর্থ পরিশোধের সিদ্ধান্তে অনিয়ম বা দুর্নীতির সম্ভাবনা থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

কর্মকর্তাদের মধ্যে দায় এড়ানোর প্রবণতা

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মঞ্জুর মোর্শেদ চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, তিনি রাশিয়া থেকে পুলিশের জন্য কোনো হেলিকপ্টার কেনেননি এবং বিষয়টি তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আবু নঈমও জানান, বর্তমান দায়িত্বে তিনি মাত্র ২৪ দিন ধরে আছেন এবং হেলিকপ্টার কেনার বিষয়ে কিছু জানেন না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, চুক্তিটি ২০২১ সালে হওয়ায় তখনকার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানেন। তাদের দাবি, রুশ প্রতিষ্ঠানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি অন্তর্বর্তী সরকারের নজরে এসেছিল।

তারা আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা হয়েছে বলে তারা শুনেছেন। তবে পুরো বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে এক ধরনের গোপনীয়তা রয়েছে।

জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, ব্যক্তি স্বার্থে জাতীয় স্বার্থকে উপেক্ষা করা হয়েছে। তাদের দাবি, কমিশনভোগী রাজনৈতিক ব্যক্তি ও দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাদের সংশ্লিষ্টতার কারণে বিষয়টি যথাসময়ে প্রকাশ্যে আসেনি।

তাদের আরও অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও স্বরাষ্ট্র সচিবকে বিষয়টি জানানো উচিত ছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তা করা হয়নি।

এখনো সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা হেলিকপ্টার ক্রয়সংক্রান্ত ফাইল নিয়ে কাজ করছেন বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।

ফলে একদিকে বিপুল অর্থ পরিশোধের পরও হেলিকপ্টার পাওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে সেগুলো গ্রহণ করাও সম্ভব হচ্ছে না। কবে নিষেধাজ্ঞা কাটবে এবং বাংলাদেশ কবে হেলিকপ্টার দুটি পাবে—তা এখনো অনিশ্চিত।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন