মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
Logo

জুলাই আন্দোলনে স্বামী নিহত, জবানবন্দি দেওয়ার পর মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগ

নিউজ ডেস্ক

চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহত মো. জসিম উদ্দিনের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত সংস্থার কাছে জবানবন্দি দেওয়ার কারণে তার বড় মেয়ে লামিয়াকে ধর্ষণ করা হয় বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন জসিমের স্ত্রী রুমা বেগম। তার দাবি, ধর্ষণের ঘটনা ছড়িয়ে পড়ার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে লামিয়া আত্মহত্যা করেন।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে জবানবন্দি দেওয়ার সময় এসব অভিযোগ করেন রুমা।

আন্দোলনে গিয়ে গুলিবিদ্ধ জসিম

রুমার জবানবন্দি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেন তার স্বামী জসিম। তখন তারা রাজধানীর আদাবর থানার শেখেরটেক এলাকায় ভাড়া থাকতেন। ওই দিন আহত অবস্থায় বাসায় ফিরে পরদিন জুমার নামাজের কথা বলে বের হন তিনি। এরপর আর বাসায় ফেরেননি।

সন্ধ্যায় প্রতিবেশীর মাধ্যমে রুমা জানতে পারেন, আন্দোলনে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে জসিম সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পড়ে আছেন। হাসপাতালে গিয়ে অপারেশন থিয়েটারের সামনে ট্রলিতে রক্তাক্ত অবস্থায় স্বামীকে দেখতে পান তিনি।

রুমার ভাষ্য, জসিম তখনও জ্ঞান হারাননি। তার বুকে গুলি লাগে এবং দুটি আঙুল উড়ে যায়। জসিম তাকে জানান, মোহাম্মদপুরের আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার পর পুলিশ ও ছাত্রলীগের গুলিতে তিনি আহত হন।

চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু

রুমা জানান, হাসপাতালে অতিরিক্ত রোগীর চাপ থাকায় চিকিৎসক-নার্সদের হিমশিম খেতে হয়। অস্ত্রোপচারের জন্য রক্তের প্রয়োজন হলে সাইফুল নামে এক আন্দোলনকারী রক্তের ব্যবস্থা করেন।

১৯ জুলাই রাতে অস্ত্রোপচারের পর পর্যবেক্ষণ কক্ষে রাখা হয় জসিমকে। পরদিন তার হাতের দুটি আঙুলে পচন ধরার বিষয়টি ধরা পড়ে। ২১ জুলাই অস্ত্রোপচার করে আঙুল দুটি কেটে ফেলা হয়।

২২ জুলাই অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আইসিইউ না থাকায় মহাখালীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালে তাকে নেওয়া হয়। সেখানে বুকে অস্ত্রোপচারের পর আর জ্ঞান ফেরেনি বলে জানান রুমা। পরে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় ২৯ জুলাই রাতে জসিম মারা যান।

মরদেহ পেতে থানায় ছোটাছুটি

রুমার অভিযোগ, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ছাড়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মরদেহ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। বনানী ও মোহাম্মদপুর থানায় যোগাযোগ করেও তিনি সাড়া পাননি বলে দাবি করেন।

তার ভাষ্য, ২৯ জুলাই রাত থেকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত দুই থানায় একাধিকবার যেতে হয় তাকে। পরে হাসপাতালের পরিচালকের মাধ্যমে দুই থানায় চিঠি দেওয়া হয়। বনানী থানার ওসি তাকে ‘ওপর মহলের হুকুমে’ ক্লিয়ারেন্স দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানান বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন রুমা।

পরে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করার পর ৩১ জুলাই স্বামীর মরদেহ পান তিনি। এরপর গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর দুমকিতে নিয়ে জসিমকে দাফন করা হয়।

কয়েকজনের বিরুদ্ধে জড়িত থাকার অভিযোগ

রুমা বলেন, পরে ঢাকায় ফিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদপত্র, ভিডিও ও স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে স্বামীর মৃত্যুর ঘটনায় বিভিন্ন ব্যক্তির জড়িত থাকার কথা জানতে পারেন।

তার অভিযোগ, শেখ হাসিনা, মেয়র তাপস ও জাহাঙ্গীর কবির নানকের নির্দেশে পুলিশ কর্মকর্তা, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিরা জসিম হত্যায় জড়িত ছিলেন। জবানবন্দিতে তিনি কয়েকজনের নামও উল্লেখ করেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে কয়েকজনকে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে গুলি করতে এবং একজনকে চাপাতি হাতে দেখেছেন বলেও দাবি করেন রুমা।

জবানবন্দি দেওয়ার পর মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগ

রুমার দাবি, ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ তিনি জসিমের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দি দিতে ঢাকায় আসেন। সঙ্গে ছিলেন তার ভাই, মেজো মেয়ে ও ছোট ছেলে। বড় মেয়ে লামিয়া তখন দুমকি কলেজের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী হওয়ায় তাকে বাড়িতে রেখে আসেন।

পরদিন ১৮ মার্চ বাবার কবর জিয়ারত করে বাড়ি ফেরার পথে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের দ্বারা লামিয়া ধর্ষণের শিকার হন বলে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেন রুমা। তার দাবি, তিনি ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে ঢাকায় আসার কারণেই মেয়েকে লক্ষ্য করে এ ঘটনা ঘটানো হয়।

রুমা বলেন, ধর্ষণের ঘটনা ছড়িয়ে পড়ার পর লামিয়া মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। পরে তিনি আত্মহত্যা করেন।

এ সময় সাক্ষ্য দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন রুমা। তিনি স্বামী জসিম উদ্দিনের মৃত্যুর পাশাপাশি মেয়ের মৃত্যুর ঘটনারও বিচার দাবি করেন।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন