হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল আগামী ১৬ ডিসেম্বর সফট ওপেনিংয়ের মাধ্যমে চালুর প্রস্তুতি চলছে। টার্মিনালটি চালু করতে প্রয়োজনীয় ৯০২ কোটি টাকার মধ্যে ৬৬৭ কোটি টাকা মেইনটেন্যান্স, ৩০ কোটি টাকা পরামর্শক সেবা এবং ২০২ কোটি টাকা বিভিন্ন ভেরিয়েশন কাজে ব্যয় হবে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। সম্প্রতি সংসদে বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত থার্ড টার্মিনাল চালু করতে ৯০২ কোটি টাকা প্রয়োজন বলে জানানোর পর এ ব্যয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
মেইনটেন্যান্সে ৬৬৭ কোটি টাকা
বেবিচক সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত ৩০ মাসের মেইনটেন্যান্স বাবদ ব্যয় হবে ৬৬৭ কোটি টাকা। এ ছাড়া ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত নির্মাণকাজের সুপারভিশন-সংক্রান্ত পরামর্শক সেবার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ কোটি টাকা।
আরও ২০২ কোটি টাকা ব্যয় হবে বিভিন্ন ভেরিয়েশন কাজে। এর মধ্যে রয়েছে টার্মিনালের বীমা, ফিক্সড গ্যাংওয়ের পরিবর্তন, দরজা-জানালার পরিবর্তন, সেফটি একাডেমি স্থাপন ও পরিচালনা, সুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের সিস্টেম পরিবর্তন, আইটি সরঞ্জাম পরিবর্তন এবং রেডিও যোগাযোগ ব্যবস্থায় ভিএইচএফের পরিবর্তে ইউএইচএফ ব্যবহারের মতো কাজ।
ইতোমধ্যে এসব অর্থ বরাদ্দের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
অর্থ ছাড় হলে গতি বাড়বে
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধিত ডিপিপিতে ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অর্থ ছাড় হলে পরবর্তী কাজগুলো শুরু হবে এবং টার্মিনাল চালুর প্রক্রিয়া আরও দ্রুত এগোবে।
বেবিচকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক কাওছার মাহমুদ জানান, ৯০২ কোটি টাকা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট সব মহল অবগত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
১৬ ডিসেম্বর সফট ওপেনিংয়ের লক্ষ্য
গত ৩০ আগস্ট সংসদে বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানান, তৃতীয় টার্মিনাল চালু করতে ৯০২ কোটি টাকা প্রয়োজন। তিনি বলেন, আগের বকেয়াসহ এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়ামকে (এডিসি) পাওনা পরিশোধ এবং প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করতেই এ অর্থ লাগবে।
মন্ত্রীর ভাষ্য, প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই সম্পদ ফেলে রাখা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। টার্মিনাল চালু হলে যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা বাড়বে এবং সেই আয় থেকে জাইকার ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হবে।
জাপানি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব মূল্যায়ন
থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার জন্য গত ১ সেপ্টেম্বর বেবিচক সদর দপ্তরে জাপানি একটি প্রতিষ্ঠান কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব জমা দিয়েছে। একই দিন প্রস্তাব দুটি উন্মুক্ত করা হয়। পরে ৩ সেপ্টেম্বর আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি ও বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এস এম লাবলুর রহমান জানান, জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা শেষে চুক্তি করার পরিকল্পনা রয়েছে। ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে সফট ওপেনিংয়ের লক্ষ্যেই তারা এগোচ্ছেন বলে জানান তিনি।
নির্মাণ প্রায় শেষ হলেও চালু হয়নি
থার্ড টার্মিনাল নির্মাণে প্রাথমিকভাবে ১৩ হাজার ৬১০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হলেও পরবর্তী সংশোধন ও অতিরিক্ত কাজ যুক্ত হওয়ায় প্রকল্প ব্যয় বেড়ে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর নির্মাণকাজ শুরু হওয়া প্রকল্পটির ৯৯ শতাংশের বেশি কাজ শেষ হওয়ার পর ২০২৩ সালের অক্টোবরে সফট উদ্বোধন করা হয়। তবে পরিচালনা ও অন্যান্য প্রস্তুতি নিয়ে জাপানের সঙ্গে সমঝোতা না হওয়ায় এতদিন টার্মিনালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি।
বছরে দুই কোটি যাত্রী সেবার সক্ষমতা
প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের তৃতীয় টার্মিনালে একসঙ্গে ৩৭টি উড়োজাহাজ পার্কিং করা যাবে। এতে ১৬টি নিয়মিত ব্যাগেজ বেল্ট, অতিরিক্ত ওজনের ব্যাগেজের জন্য চারটি পৃথক বেল্ট এবং ১০০টি চেক-ইন কাউন্টার থাকবে।
এ ছাড়া ১০টি সেলফ চেক-ইন কিওস্ক, স্বয়ংক্রিয় ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা, বেবি কেয়ার লাউঞ্জ, ফার্স্ট এইড ও হেলথ ইন্সপেকশন রুম, আইসোলেশন এরিয়া এবং যাত্রীদের জন্য বিভিন্ন আধুনিক সুবিধা রাখা হয়েছে।
বর্তমানে বিমানবন্দরের প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মিনাল বছরে প্রায় ৮০ লাখ যাত্রী সামলাতে পারে। তৃতীয় টার্মিনাল যুক্ত হলে বছরে প্রায় দুই কোটি যাত্রীকে সেবা দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি হবে।
১৬ ডিসেম্বর সীমিত পরিসরে সফট ওপেনিংয়ের লক্ষ্যে বর্তমানে বিভিন্ন সিস্টেম পরীক্ষা, অপারেশনাল প্রস্তুতি, জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

