স্মার্টফোন ও ইলেকট্রনিকসের গণ্ডি পেরিয়ে বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) বাজারে আরও বড় পরিসরে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে চীনা প্রযুক্তি জায়ান্ট শাওমি। ২০২৭ সালের মধ্যে ইউরোপের বাজারে নিজেদের তৈরি বৈদ্যুতিক গাড়ি নিয়ে আসার ঘোষণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বার্লিনে অনুষ্ঠিত আইএফএ-২০২৬ মেলায় শাওমি জানিয়েছে, ইউরোপে তাদের ইভি শুধু পরিবহনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং স্মার্টফোন ও স্মার্ট-হোম ডিভাইসের সঙ্গে সমন্বিত একটি বড় প্রযুক্তি ইকোসিস্টেমের অংশ হিসেবে কাজ করবে।
গাড়ি হবে স্মার্ট-হোমের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র
শাওমির পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে ‘হিউম্যান এক্স কার এক্স হোম’ ইকোসিস্টেম। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীর স্মার্টফোন, গাড়ি এবং বাড়ির বিভিন্ন সংযুক্ত ডিভাইস একই নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকবে।
আইএফএতে শাওমি দেখিয়েছে, গাড়িতে বসেই বাড়ির বিভিন্ন স্মার্ট ডিভাইস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। গাড়ি থেকে ঘরের পর্দা খোলা বা বন্ধ করা এবং এয়ারকন্ডিশনিং চালু বা বন্ধ করার মতো কাজ করা যাবে।
অর্থাৎ, গাড়িটিই ভবিষ্যতে স্মার্ট-হোমের আরেকটি নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কর্মস্থল থেকে ফেরার সময় বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই গাড়িতে বসে এয়ারকন্ডিশনিং চালু করে দেওয়া যাবে।
এআই ও হাইপারওএসে সমন্বিত প্রযুক্তি
শাওমির দাবি, তাদের হাইপারওএস অপারেটিং সিস্টেম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গাড়ি, স্মার্টফোন ও বাড়ির বিভিন্ন ডিভাইসের মধ্যে সমন্বয় তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য শুধু ব্যবহারকারীকে প্রতিটি ডিভাইস আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেওয়া নয়। বরং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও ব্যবহারকারীর প্রয়োজন বুঝে এআই যেন বিভিন্ন ডিভাইসের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয় করতে পারে, সেই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় শাওমি।
আইএফএতে দেখানো হলো বৈদ্যুতিক হাইপারকার
আইএফএতে শাওমি তাদের ‘ভিশন গ্রান তুরিসমো’ নামে একটি বৈদ্যুতিক হাইপারকার কনসেপ্টও প্রদর্শন করেছে। গ্রান তুরিসমো রেসিং গেম সিরিজকে কেন্দ্র করে তৈরি এই ধারণাভিত্তিক গাড়িতে আধুনিক নকশা, অ্যারোডাইনামিকস ও ডিজিটাল ইন্টারঅ্যাকশনের বিভিন্ন ধারণা তুলে ধরা হয়েছে।
তবে এটি আপাতত কনসেপ্ট পর্যায়েই রয়েছে। শিগগিরই গাড়িটি উৎপাদনে গিয়ে ইউরোপের সড়কে চলবে—এমন কোনো ঘোষণা দেয়নি শাওমি।
জার্মানিতে ৮ অটোমোটিভ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি
ইউরোপে প্রবেশের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে জার্মানির আটটি অটোমোটিভ রিটেইল গ্রুপের সঙ্গে আগ্রহপত্র (এলওআই) সই করেছে শাওমি।
প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—এমিল ফ্রে জার্মানি, আর্নস্ট ডেলো গ্রুপ, অটোহাউস ডিনেবিয়ার, হান অটোমোবাইল, লুয়েগ মোবিলিটি গ্রুপ, ফেট অ্যান্ড উইর্টজ, এসপিটি অ্যাভিওর এবং পেনস্ক-জ্যাকবস।
৩ সেপ্টেম্বর আইএফএ প্রেস কনফারেন্সে এসব অংশীদারত্বের ঘোষণা দেওয়া হয়। জার্মানিকে ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে বিবেচনা করছে শাওমি। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য ইউরোপীয় দেশেও একই ধরনের অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
গবেষণায় ২৪ বিলিয়ন ইউরোর বেশি বিনিয়োগ
বৈদ্যুতিক গাড়ি ও স্মার্ট প্রযুক্তিতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে বড় ধরনের গবেষণা ও উন্নয়ন বিনিয়োগের পরিকল্পনাও জানিয়েছে শাওমি।
কোম্পানির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে ২৪ বিলিয়ন ইউরোর বেশি বিনিয়োগ করা হবে।
এই বিনিয়োগের আওতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অপারেটিং সিস্টেম, সেমিকন্ডাক্টর, স্মার্ট বা ইন্টেলিজেন্ট ভেহিকল, রোবোটিকস এবং স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং প্রযুক্তির উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
ফলে শাওমির জন্য বৈদ্যুতিক গাড়ি এখন শুধু নতুন একটি পণ্য নয়; বরং স্মার্টফোন, গাড়ি ও স্মার্ট-হোমকে একই প্রযুক্তিগত কাঠামোয় যুক্ত করার বৃহত্তর পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।

