চলতি বছরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনা ক্রমেই কমছে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রস্তুতি থাকলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বার্ষিক পরীক্ষা, ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার কারণে এ বছর ভোট আয়োজন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। ফেব্রুয়ারির ৮ তারিখ থেকে রমজান শুরুর সম্ভাব্য সময় বিবেচনায় নিয়ে তার আগেই প্রথম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি ইসিতে আলোচনায় রয়েছে।
তবে এখনো নির্বাচনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি। ইসি সূত্র বলছে, নভেম্বরকে লক্ষ্য ধরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, চলতি বছরের শেষ দিকে অথবা আগামী বছরের শুরুতেও নির্বাচন হতে পারে।
বার্ষিক পরীক্ষায় জটিলতা
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনে বিপুলসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ভোটকেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত করতে হয়। একই সঙ্গে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের বিষয়ও রয়েছে।
বছরের শেষ দিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বার্ষিক পরীক্ষা থাকায় স্কুল-কলেজকে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ কারণে আগামী বছরের শুরুতে নির্বাচন আয়োজনকে তুলনামূলক বাস্তবসম্মত মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে ভোট হলে পরীক্ষার চাপ না থাকায় ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা ও নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে প্রশাসনের ওপর চাপও কমবে। শীতকালীন আবহাওয়াও ভোট আয়োজনের জন্য অনুকূল বলে মনে করছেন তারা।
কয়েক ধাপে হতে পারে ভোট
ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচন দিয়েই স্থানীয় সরকারের ভোট শুরু করার সিদ্ধান্ত রয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় আরও বিস্তৃত। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদের জন্য পৃথক প্রস্তুতি নিতে হয়। ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ, ভোটার তালিকা হালনাগাদ, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনাসহ নানা কাজ রয়েছে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, নভেম্বর ভোটের উপযুক্ত সময় নয়। তাঁর মতে, নির্বাচন শেষ পর্যন্ত জানুয়ারিতে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। শীতকালে নির্বাচন হলে ভোটারদের অংশগ্রহণের পরিবেশও ভালো থাকবে।
সাইফুল হকের ধারণা, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন পাঁচ থেকে ছয় ধাপে হতে পারে। এরপর পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও উপজেলা পরিষদের নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। ফলে পুরো প্রক্রিয়ায় কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে।
মাঠে রাজনৈতিক প্রস্তুতি
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়ার পাশাপাশি দলীয় সমর্থন পেতে তৎপরতা চালাচ্ছেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী জানিয়েছেন, বিএনপি এককভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেবে। তবে দলীয় প্রতীক বা দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে না। তৃণমূল থেকে প্রার্থী বাছাই করে তাদের সমর্থন দেওয়া হবে।
রিজভী বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে কারা অংশ নিতে পারবেন বা পারবেন না, সেটি নির্বাচন কমিশন ও আদালতের বিষয়। প্রচলিত আইন ও নতুন প্রণীত আইন অনুযায়ী এ বিষয়ে ইসি সিদ্ধান্ত নেবে।
এদিকে বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোও নিজ নিজ প্রার্থী মাঠে নামানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক জানান, যেসব এলাকায় শরিক দলগুলোর অবস্থান ভালো, সেখানে তারা বিএনপির সমর্থন চাইতে পারে। তবে জোটগতভাবে নির্বাচনে যাওয়ার পরিকল্পনা নেই।
গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরীও শীতের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁর মতে, ভোটের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ইসির আলোচনা করা প্রয়োজন। জনগণ যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে ভোট দিতে পারে, সে জন্য উপযুক্ত সময় নির্ধারণ জরুরি।
সব মিলিয়ে চলতি বছরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়লেও আগামী বছরের শুরুতে ভোট আয়োজনের সম্ভাবনা জোরালো হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও সার্বিক পরিস্থিতির ওপর।

