প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বিগত ১৭ বছরের দুর্নীতি নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তৈরি শ্বেতপত্রের আলোকে বর্তমান সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি কমিটি গঠন করে দেশের অর্থনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছিল। ওই প্রতিবেদনে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি সামগ্রিক চিত্র উঠে এসেছে। সেই শ্বেতপত্রকে সামনে রেখেই পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছে বর্তমান সরকার।
প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি ঠেকাতে উদ্যোগ
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে একক কোনো কারণ নেই বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রকল্প প্রণয়ন ও অনুমোদন, ভূমি অধিগ্রহণ, অর্থায়ন, ক্রয় প্রক্রিয়া এবং ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দুর্বলতা মিলেই এ ধরনের সমস্যা তৈরি হয়।
তিনি জানান, এসব সমস্যার মধ্যে রয়েছে দুর্বল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, প্রকল্প ব্যয়ের যথাযথ প্রাক্কলন না হওয়া, প্রকল্প এলাকা নির্বাচনে দুর্বলতা, ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরে বিলম্ব, ক্রয় প্রক্রিয়ায় ধীরগতি, সময়মতো প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না দেওয়া, দুর্বল তদারকি ও জবাবদিহি এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের ঘাটতি।
এসব সমস্যা সমাধানে নতুন প্রকল্প গ্রহণের আগে নির্ভুল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা নিশ্চিত করা, প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তুতি দ্রুত সম্পন্ন করা, চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি মনিটরিংয়ে ড্যাশবোর্ড স্থাপন এবং নিয়মিত পর্যালোচনা ও মাঠপর্যায়ে তদারকি জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়া প্রকল্পের বিলম্ব, অনিয়ম ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণ পর্যালোচনা করে দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
৩০ শতাংশের কম বাস্তবায়ন অগ্রগতি থাকা প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে পুনর্বিন্যাস, পরিধি পরিবর্তন বা চলমান রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি সমন্বিত কর্মসূচির আওতায় গুচ্ছ প্রকল্প গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ই-জিপির ব্যবহার সম্প্রসারণ, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ এবং সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও জবাবদিহিমূলক করতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস, ২০২৫ হালনাগাদের উদ্যোগের কথাও জানান তিনি।
গ্যাস সংকট মোকাবিলায় ১৫০ কূপ খননের পরিকল্পনা
শিল্প খাতে সাময়িক ও আকস্মিক গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথাও সংসদে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক জরিপ পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
সমুদ্রাঞ্চলের ২৬টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক বিডিং রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। এতে দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা নভেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
বর্তমানে দেশে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে গড়ে দৈনিক প্রায় ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয় বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
ভবিষ্যতের গ্যাস সংকট মোকাবিলায় মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ীতে একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কুতুবজোমের টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং মাতারবাড়ীর টার্মিনাল থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে গ্যাস সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে।
এ ছাড়া পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা কিংবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় আরও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে।
ভোলার গ্যাস স্থানীয়ভাবে ব্যবহারের পরিকল্পনা
ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডে নিতে প্রায় সাত বছর সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ কারণে সেখানে গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানা স্থাপনের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে গ্যাস ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে সরকার।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে কয়েকজন শিল্প উদ্যোক্তা ভোলায় গ্যাসনির্ভর কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছেন। এতে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ওই অঞ্চলের অর্থনীতির পরিধিও বাড়বে।
ভোলায় একটি সার কারখানা এবং ৫০০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বুধবার বিকেল সাড়ে ৩টায় অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনের প্রথম ৩০ মিনিট ছিল প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব।

