সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
Logo

ব্রিকসের মঞ্চে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির ডাক, পাশে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত

নিউজ ডেস্ক

নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের প্রথম দিনেই গৃহীত যৌথ ঘোষণাপত্রে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ও উত্তেজনা দ্রুত প্রশমনের জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে। জোটের সদস্য ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও এই ঘোষণায় সমর্থন দিয়েছে। আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থানে পার্থক্য থাকলেও একই ঘোষণার পক্ষে তাদের অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। খবর রয়টার্সের।

সম্মেলনের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও আবুধাবির যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকটিও বিশেষ তাৎপর্য বহন করেছে। চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনা শুরুর পর দুই দেশের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক আলোচনা। আবুধাবির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং উত্তেজনা প্রশমনের উপায় নিয়ে দুই নেতা বিস্তারিত আলোচনা করেন।

এ বৈঠকের তাৎপর্য শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ইরান ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য কমিয়ে সংলাপের পরিসর তৈরি করা ব্রিকসের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরীক্ষা। সেই বিবেচনায় সম্মেলনের মঞ্চে দুই দেশের সমর্থন পাওয়া জোটটির অভ্যন্তরীণ সমন্বয় তৈরির সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

সম্মেলন শেষে প্রকাশিত ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’য় কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ না করে একতরফা সামরিক আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সব রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কূটনৈতিকভাবে দেশনির্দিষ্ট অভিযোগ এড়িয়ে নীতিগত অবস্থানের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার এই কৌশল ব্রিকসের বিস্তৃত সদস্যপদ ও ভিন্ন ভিন্ন ভূরাজনৈতিক স্বার্থের মধ্যে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য ধরে রাখার প্রচেষ্টাকেই প্রতিফলিত করে।

ঘোষণায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেও সদস্য দেশগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব শুধু নিরাপত্তা ও মানবিক সংকটে সীমাবদ্ধ না থেকে জ্বালানি বাজার, সরবরাহব্যবস্থা ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার মধ্যেই এ বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

গাজা সংকট ও ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকারও ঘোষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাবের আলোকে গাজায় অবিলম্বে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা এবং নির্বিঘ্নে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করা হয়েছে।

যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করাই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানের অন্যতম ভিত্তি। এর মাধ্যমে ব্রিকস শুধু তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির প্রশ্নেই নয়, বরং ফিলিস্তিন সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তার দিকেও জোর দিয়েছে।

সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও রাজনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়ে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি অর্জনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। ফলে মধ্যপ্রাচ্য সংকটকে ঘিরে ব্রিকসের অবস্থানে সামরিক সমাধানের পরিবর্তে কূটনীতি, সংলাপ ও রাজনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিকসের এই যৌথ ঘোষণা রাতারাতি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দেবে—এমন প্রত্যাশার সুযোগ নেই। তবে ভিন্ন কৌশলগত স্বার্থ ও আঞ্চলিক অবস্থান থাকা সদস্যদের একই ঘোষণার আওতায় আনা জোটটির অভ্যন্তরীণ কূটনৈতিক সমন্বয়ের সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে অভিন্ন অবস্থান তুলে ধরে বৈশ্বিক কূটনীতিতে ব্রিকস যে ক্রমেই আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে চাইছে, নয়াদিল্লি ঘোষণাকে তারই একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন