সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
Logo

জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব কে হচ্ছেন, এগিয়ে যিনি

নিউজ ডেস্ক

জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উত্তরসূরি হতে আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অনানুষ্ঠানিক ভৌগোলিক ভারসাম্যের হিসাব অনুযায়ী, এবার লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে মহাসচিব নির্বাচনের সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের ৮০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো নারীকে এই পদে বসানোর দাবিও জোরদার হচ্ছে।

১৯৫৩ সালের এপ্রিলে নিউইয়র্কের আইডলওয়াইল্ড বিমানবন্দরে নিজের উত্তরসূরি সুইডিশ কূটনীতিক দাগ হামারশোল্ডকে স্বাগত জানিয়ে তৎকালীন মহাসচিব ত্রিগভে লি বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে অসম্ভব চাকরিতে স্বাগতম।’ সাত দশক পরও বিশ্বের শীর্ষ কূটনৈতিক পদগুলোর একটি হিসেবে জাতিসংঘ মহাসচিবের দায়িত্বের কঠিনতাকে ঘিরে সেই মন্তব্য এখনও প্রাসঙ্গিক।

সাধারণত মহাসচিবের মেয়াদ পাঁচ বছর। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, একজন মহাসচিব পরপর দ্বিতীয় মেয়াদেও দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান। এবার গুতেরেসের উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় আলোচনায় রয়েছেন বিভিন্ন অঞ্চলের আট প্রার্থী।

লাতিন আমেরিকার প্রার্থীদের দাপট

পরবর্তী মহাসচিব লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে আসতে পারেন—এমন আলোচনা রয়েছে। এ অঞ্চল থেকে সর্বশেষ মহাসচিব ছিলেন পেরুর হাভিয়ের পেরেজ দে কুয়েলার, যিনি ১৯৯২ সালে দায়িত্ব ছাড়েন।

এর পাশাপাশি নারী মহাসচিব নিয়োগের দাবিও এবার নতুন মাত্রা পেয়েছে। লাতিন আমেরিকার একাধিক নারী প্রার্থী প্রতিযোগিতায় থাকায় দুটি সম্ভাবনাই একসঙ্গে বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সামনে কঠিন বাস্তবতা

নতুন মহাসচিব এমন এক সময়ে দায়িত্ব নেবেন, যখন জাতিসংঘকে একাধিক সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সংস্থাটির সবচেয়ে বড় অর্থদাতা যুক্তরাষ্ট্র স্বেচ্ছা তহবিলে অর্থ দেওয়া কমিয়েছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সম্পর্কেও টানাপোড়েন রয়েছে।

সদস্যদেশগুলোর বকেয়া চাঁদা জাতিসংঘের অর্থনৈতিক সংকট আরও বাড়িয়েছে। পাশাপাশি গাজা, সুদান ও ইউক্রেনের যুদ্ধ বন্ধে নিরাপত্তা পরিষদের কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারায় জাতিসংঘের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

তাই নতুন মহাসচিবের দায়িত্ব শুধু আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রতিষ্ঠানটির দক্ষতা বাড়ানো, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং জাতিসংঘকে আরও কার্যকর বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে পরিণত করাও হবে তার বড় চ্যালেঞ্জ।

যেভাবে নির্বাচিত হন মহাসচিব

মহাসচিব নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০২৫ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে। সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতিরা সদস্যদেশগুলোর কাছে প্রার্থী মনোনয়নের আহ্বান জানান।

জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী, ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদ একজন প্রার্থীকে সুপারিশ করে। এরপর ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদ সেই প্রার্থীকে অনুমোদন দেয়।

তবে বাস্তবে মহাসচিব নির্বাচনের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে নিরাপত্তা পরিষদে। কোনো প্রার্থীকে অন্তত নয়টি দেশের সমর্থন পেতে হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীনের কোনো দেশ যেন ওই প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভেটো না দেয়।

গোপন ভোটে এগিয়ে ক্যারোলিন

প্রার্থীদের অবস্থান বোঝার জন্য নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা অনানুষ্ঠানিক ও গোপন ভোট দেন। এই ভোটকে বলা হয় ‘স্ট্র পোল’। এতে তিন ধরনের মতামত দেওয়া হয়—‘এনকারেজ’ অর্থ ইতিবাচক সমর্থন, ‘নো ওপিনিয়ন’ অর্থ সিদ্ধান্তহীনতা এবং ‘ডিসকারেজ’ অর্থ নেতিবাচক অবস্থান।

এখন পর্যন্ত দুটি স্ট্র পোল অনুষ্ঠিত হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় সবচেয়ে ভালো ফল করেছেন গায়ানার ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বির্কেট। তিনি পেয়েছেন আটটি ‘এনকারেজ’, তিনটি ‘ডিসকারেজ’ ও চারটি ‘নো ওপিনিয়ন’ ভোট।

ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বির্কেট

জাতিসংঘে গায়ানার দূত ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বির্কেট এর আগে দেশটির পররাষ্ট্র ও আদিবাসীবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তিনি নিরাপত্তা পরিষদে গায়ানার প্রতিনিধিত্ব করেন।

ক্যারিবীয় দেশগুলোর জোট ক্যারিকম আনুষ্ঠানিকভাবে তার প্রার্থিতাকে সমর্থন করেছে। ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য নিজেকে নীতিনিষ্ঠ ও বাস্তববাদী প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি।

রদ্রিগেস-বির্কেট জাতিসংঘ সনদের ৯৯ অনুচ্ছেদ আরও সক্রিয়ভাবে ব্যবহারের পক্ষে। এই অনুচ্ছেদের আওতায় মহাসচিব সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার হুমকি নিরাপত্তা পরিষদের নজরে আনতে পারেন।

রেবেকা গ্রিনস্প্যান

কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান প্রথম স্ট্র পোলে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে ছিলেন। জুলাইয়ের ভোটে তিনি ১০টি ‘এনকারেজ’ ও মাত্র একটি ‘ডিসকারেজ’ ভোট পান। তবে আগস্টের দ্বিতীয় ভোটে তার সমর্থন কমে সাতটি ‘এনকারেজ’ এবং চারটি ‘ডিসকারেজ’ ভোটে দাঁড়ায়।

মহাসচিব হলে তিনি জাতিসংঘের কার্যালয় পুনর্গঠন, মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সংস্থার ভূমিকা জোরদার এবং বিভিন্ন বিভাগের কাজের পুনরাবৃত্তি কমানোর ওপর গুরুত্ব দিতে চান। দরিদ্র দেশগুলোর ঋণের চাপ কমানোও তার অন্যতম অগ্রাধিকার।

রাফায়েল গ্রোসি

আর্জেন্টিনার রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক হিসেবে সাত বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। চার দশকের কূটনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই প্রার্থী নিজেকে কোনো শক্তিশালী দেশের ওপর নির্ভরশীল নন—এমন একজন স্বাধীন কূটনীতিক হিসেবে তুলে ধরছেন।

শান্তি ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন, মানবাধিকার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং বাস্তববাদী বহুপক্ষীয় কূটনীতিকে তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন। আগস্টের স্ট্র পোলে গ্রোসি সাতটি ‘এনকারেজ’ ও ছয়টি ‘ডিসকারেজ’ ভোট পান।

তবে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে আর্জেন্টিনার সার্বভৌমত্বের দাবি নতুন করে আলোচনায় আসায় তার প্রার্থিতার ক্ষেত্রে কিছু কূটনৈতিক জটিলতাও রয়েছে।

নারী প্রার্থীদের মধ্যে মারিয়া ফার্নান্দা

ইকুয়েডরের কূটনীতিক মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা ২০১৮-১৯ মেয়াদে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ছিলেন। ওই পদে দায়িত্ব পালন করা মাত্র চতুর্থ নারী এবং লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে প্রথম ব্যক্তি ছিলেন তিনি।

ইকুয়েডরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেও দুই দফা দায়িত্ব পালন করেছেন এসপিনোসা। সম্ভাব্য সংকট আগেই শনাক্ত করতে ‘প্রিভেনশন অ্যান্ড আর্লি অ্যাকশন হাব’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক নীতিমালা প্রণয়নও তার অন্যতম অগ্রাধিকার।

তবে আগস্টের স্ট্র পোলে তিনি চারটি ‘এনকারেজ’ ভোট পেয়েছেন, যা তাকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য কঠিন অবস্থানে ফেলেছে।

অভিজ্ঞ মিশেল ব্যাশেলেও পিছিয়ে

চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাশেলে দুই মেয়াদে দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। পরে ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি জাতিসংঘের আমলাতন্ত্র কমিয়ে সংস্থাটিকে আরও কার্যকর করার কথা বলেছেন। জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য হ্রাস ও দূষণকে তিনি বৈশ্বিক ‘ত্রিমুখী সংকট’ হিসেবে দেখেন।

তবে দ্বিতীয় স্ট্র পোলে তার অবস্থান দুর্বল হয়েছে। তিনি মাত্র দুটি ‘এনকারেজ’ এবং ছয়টি ‘ডিসকারেজ’ ভোট পেয়েছেন।

আফ্রিকার দুই প্রার্থীও দৌড়ে

প্রতিযোগিতায় রয়েছেন সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল। ২০১২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। তার প্রচারের মূল বক্তব্য হলো ‘নতুন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা’। জাতিসংঘের আলোচনায় আফ্রিকার স্বার্থকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন তিনি।

উগান্ডার ওলার ওতুনুও একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিক। জাতিসংঘে উগান্ডার রাষ্ট্রদূত ও দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৭ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত শিশু ও সশস্ত্র সংঘাত বিষয়ে জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্বও পালন করেন তিনি।

আগস্টের স্ট্র পোলে ওতুনুর অবস্থানের উন্নতি হয়েছে। তবে লাতিন আমেরিকার প্রার্থীর সম্ভাবনা এবং প্রথম নারী মহাসচিব নিয়োগের প্রত্যাশা তার পথ কঠিন করে তুলতে পারে।

সবচেয়ে পিছিয়ে ইভন এ-বাকি

প্রতিযোগিতার আরেক প্রার্থী ইকুয়েডরের ইভন এ-বাকি। তাকে মনোনয়ন দিয়েছে টোঙ্গা। সংঘাত নিরসনকে নিজের প্রচারের কেন্দ্রে রেখেছেন তিনি। পাশাপাশি নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার এবং আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের জন্য স্থায়ী প্রতিনিধিত্বের দাবিও জানিয়েছেন।

তবে আগস্টের স্ট্র পোলে তার ফল সবচেয়ে দুর্বল। কোনো ‘এনকারেজ’ ভোট না পেলেও আটটি ‘ডিসকারেজ’ এবং সাতটি ‘নো ওপিনিয়ন’ ভোট পেয়েছেন তিনি।

শেষ হাসি কার?

দ্বিতীয় দফার গোপন ভোটের ফল বলছে, এই মুহূর্তে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন গায়ানার ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বির্কেট। তবে জাতিসংঘ মহাসচিব নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্ট্র পোলের ফলই চূড়ান্ত নয়। শেষ মুহূর্তের কূটনৈতিক সমঝোতা, নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের অবস্থান এবং আঞ্চলিক ভারসাম্যের হিসাব বড় ভূমিকা রাখবে।

সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হলে প্রার্থীদের নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতাও আরও বাড়তে পারে। নতুন মহাসচিব আগামী ১ জানুয়ারি দায়িত্ব নেবেন। এখন দেখার বিষয়, জাতিসংঘের সেই ‘পৃথিবীর সবচেয়ে অসম্ভব চাকরি’ শেষ পর্যন্ত কার হাতে ওঠে।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন