সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
Logo

ছয় দশকে ফিলিস্তিনি ভূমিতে ইসরাইলি বসতির দাপট, বেড়েছে সহিংসতাও

ডেস্ক রিপোর্ট।।

দূর থেকে অনেক ইসরাইলি বসতিকে সাধারণ শহরতলির মতোই মনে হয়। একই ধরনের বাড়ি, লাল টাইলের ছাদ, সাজানো বাগান—সবই রয়েছে। তবে এসব বসতির অনেকগুলো পাহাড়ের চূড়ায় এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যেখান থেকে আশপাশের ফিলিস্তিনি শহর ও গ্রামগুলো সহজেই দেখা যায়।

ছয় দশকে বদলে গেছে বসতির চিত্র

১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার আগে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদি বসতির সংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে কম। তবে ১৯৬৭ সালে ইসরাইল পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর থেকে এসব বসতির বিস্তার দ্রুত বাড়তে থাকে।

বর্তমানে ইসরাইলি বসতিগুলো আর বিচ্ছিন্ন কয়েকটি পাহাড়ি এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এসব বসতির সঙ্গে গড়ে উঠেছে সড়ক, মহাসড়ক ও নানা ধরনের অবকাঠামো। এর ফলে বসতিগুলো নিজেদের মধ্যে এবং ইসরাইলের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছে।

ইসরাইলি বসতিবিরোধী সংগঠন পিস নাও-এর তথ্য অনুযায়ী, অধিকৃত পশ্চিম তীরে অন্তত ১৪৮টি এবং পূর্ব জেরুজালেমে ১৫টি ইসরাইলি বসতি রয়েছে। এসব বসতিতে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার ইসরাইলি বসবাস করছেন।

২০২৪ সালের হিসাবে পশ্চিম তীরে বসবাসকারী ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ লাখ ১১ হাজার ১০০। পূর্ব জেরুজালেমে ছিলেন আরও প্রায় ২ লাখ ৩৩ হাজার ৬০০ জন। সব মিলিয়ে সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৭ লাখ ৪৪ হাজার ৭০০।

এর বাইরে পশ্চিম তীরজুড়ে ৪০০টিরও বেশি অবৈধ আউটপোস্ট রয়েছে। এগুলো সাধারণত আনুষ্ঠানিক সরকারি অনুমোদন ছাড়াই ছোট আকারে গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে কিছু আউটপোস্টকে স্বীকৃত বসতির সঙ্গে যুক্ত করা হয় কিংবা বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

বসতি ও আউটপোস্টের মধ্যে অবশ্য পার্থক্য রয়েছে। ইসরাইলি সরকারের অনুমোদন, পরিকল্পনা ও অর্থায়নের মাধ্যমে সাধারণত বসতিগুলো গড়ে ওঠে। অন্যদিকে আউটপোস্টগুলো অনেক সময় সরকারি অনুমোদন ছাড়াই স্থাপন করা হয়।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ইসরাইলি বসতিগুলো অবৈধ। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এবং আন্তর্জাতিক রেড ক্রসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এ অবস্থান জানিয়েছে।

বসতি ও সড়কের জালে বিচ্ছিন্ন ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড

বড় ইসরাইলি বসতিগুলোর কিছু এখন ছোট শহরের রূপ নিয়েছে। এসব এলাকায় রয়েছে মেয়রের কার্যালয়, স্কুল, শপিংমল, হাসপাতাল এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ও। মোদিইন ইলিত, বেইতার ইলিত ও পিসগাত জেভ বড় বসতিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

এসব বসতিকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করতে নির্মাণ করা হয়েছে বিভিন্ন সড়ক। এর কিছু সড়ক ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের মধ্য দিয়েও গেছে। সড়ক, চেকপোস্ট ও বিভিন্ন ধরনের অবরোধের কারণে অনেক ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনিদের চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে একাধিক ফিলিস্তিনি এলাকা।

এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ই১ এলাকা। জেরুজালেমের পূর্বদিকে অবস্থিত এ এলাকায় মালে আদুমিম বসতি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পূর্ব জেরুজালেম পশ্চিম তীরের অন্যান্য অংশ থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।

২০২৫ সালের আগস্টে ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ ই১ এলাকায় ৩ হাজারের বেশি নতুন বাড়ি নির্মাণের অনুমোদন দেন। তিনি দাবি করেন, এই পদক্ষেপ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণাকে ‘কবর’ দেবে।

ইসরাইলের এ সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে প্রায় ৩০টি দেশ ও ইউরোপীয় কমিশন। তাদের পক্ষ থেকে এটিকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ও অগ্রহণযোগ্য ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণ হিসেবে অভিহিত করা হয়।

কেন বসতিতে যাচ্ছেন ইসরাইলিরা?

ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের একটি বড় অংশ অর্থনৈতিক সুবিধার কারণে এসব এলাকায় বসবাস করেন। তুলনামূলক কম ভাড়া, সরকারি ভর্তুকি, সস্তা জমি ও ঋণের সুবিধা তাদের আকৃষ্ট করে।

তবে বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী একটি গোষ্ঠীও রয়েছে, যারা মনে করে এই ভূমি ঈশ্বর তাদের জন্য নির্ধারণ করেছেন। ‘হিলটপ ইয়ুথ’ নামে পরিচিত একটি গোষ্ঠী নতুন আউটপোস্ট স্থাপন এবং ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে হামলার জন্য পরিচিত।

রেকর্ড পর্যায়ে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা

ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণের পাশাপাশি বসতি স্থাপনকারীদের হাতে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার ঘটনাও বাড়ছে।

জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তর (ওসিএইচএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর বসতি স্থাপনকারীদের হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শুধু ২০২৫ সালে ১ হাজার ৮৩৬টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল ৮৫২টি। অর্থাৎ ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচটি হামলার ঘটনা ঘটেছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ১৩১টি হামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। ২০২৬ সালেও এই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত আরও ১ হাজার ৪১৮টি হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।

পশ্চিম তীরে নতুন ইসরাইলি বসতি স্থাপন এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা আলাদা দুটি বিষয় হলেও, উভয় প্রবণতাই অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণের একটি বৃহত্তর চিত্র তুলে ধরছে। বসতি, সড়ক ও অবকাঠামোর বিস্তার যেমন ভূখণ্ডের চেহারা বদলে দিচ্ছে, তেমনি বাড়ছে ফিলিস্তিনিদের চলাচল ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন