মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
Logo

বিমান কি বোয়িংয়ের আরও ১১ উড়োজাহাজ কিনছে?

নিউজ ডেস্ক

বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে আরও উড়োজাহাজ কিনতে যাচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত ও ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গরের সাম্প্রতিক এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের পর এমন আলোচনা নতুন করে সামনে এসেছে। তিনি বিষয়টিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে আরেকটি ‘দারুণ চুক্তি’ হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।

এর আগে গত ৩০ এপ্রিল বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। চুক্তির আওতায় ১০টি ওয়াইড-বডি ৭৮৭ ড্রিমলাইনার ও চারটি ন্যারো-বডি ৭৩৭ ম্যাক্স কেনার কথা রয়েছে। এসব উড়োজাহাজের বাজারমূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা।

তবে সার্জিও গরের বক্তব্যে নতুন করে কতটি উড়োজাহাজ কেনা হবে, এর মূল্য কত কিংবা নতুন কোনো চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে বিস্তারিত কিছু উল্লেখ করা হয়নি। ফলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর সম্প্রসারণ নিয়ে নতুন করে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

সার্জিও গরের পোস্টে যত আলোচনা

গত ৩০ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় সার্জিও গর জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এমন একটি চুক্তিতে পৌঁছেছেন, যার আওতায় বাংলাদেশ বোয়িং উড়োজাহাজের জন্য তাদের প্রাথমিক অর্ডার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে।

আরেক অংশে তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্রাথমিক অর্ডারের চেয়ে শত শত কোটি ডলার বেশি ব্যয় করে আরও বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

তবে পোস্টে নতুন অর্ডারের সংখ্যা, মোট ব্যয়, চুক্তির সময় বা আনুষ্ঠানিকতার বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

এর আগে গত ৩১ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন সার্জিও গর। ওই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং দুই দেশের অংশীদারত্ব আরও জোরদারের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়।

বর্তমানে বিমানের বহরে ১৯ উড়োজাহাজ

বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে রয়েছে ১৯টি উড়োজাহাজ। এর বাইরে বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী, প্রথম উড়োজাহাজ ২০৩১ সালের অক্টোবরে সরবরাহ শুরু হতে পারে। এরপর ধাপে ধাপে ২০৩৫ সালের মধ্যে সব উড়োজাহাজ হস্তান্তর করার কথা রয়েছে।

এদিকে ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসও বিমানকে ১০টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবে ছয়টি এ৩৫০-৯০০ ওয়াইড-বডি এবং চারটি এ৩২১ নিও ন্যারোবডি উড়োজাহাজ রয়েছে।

পাশাপাশি আরও ১০টি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে বিমানের। ফলে আগামী কয়েক বছরে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্সটির বহর বর্তমানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বড় হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

২৫ বোয়িং নিয়ে আলোচনা হয়েছিল?

বিমান ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং শুল্কসংক্রান্ত আলোচনার প্রেক্ষাপটে বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি সামনে আসে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২৫টি বোয়িং কেনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ১৪টি উড়োজাহাজের বাইরে আরও বোয়িং কেনার বিষয়ে সার্জিও গর ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা এখনো বিমানের অনেকের কাছেই পরিষ্কার নয়।

অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলামের ধারণা, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য স্বাভাবিক রাখার অংশ হিসেবে ২৫টি বোয়িং কেনার যে আলোচনা হয়েছিল, সার্জিও গর হয়তো সেটিকেই ইঙ্গিত করেছেন।

তার মতে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের বাজারে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর অংশগ্রহণ এখন প্রায় ২৫-২৬ শতাংশে নেমে এসেছে। একসময় নব্বইয়ের দশকে এই অংশীদারত্ব প্রায় ৬৯ দশমিক ৬০ শতাংশ ছিল। তাই বাজার পুনরুদ্ধার করতে বিমানের বহর বাড়ানো প্রয়োজন।

তবে কোন রুটে কোন ধরনের উড়োজাহাজ প্রয়োজন, সেটি বাণিজ্যিক পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণ করতে হবে বলেও মনে করেন তিনি।

বহর বাড়ানোর পক্ষে বিশেষজ্ঞরা

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য ও অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম মনে করেন, বিমানের বহর সম্প্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে।

তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার কথা বলা হলেও বর্তমানে ১৪টির জন্য চুক্তি হয়েছে। বাকি ১১টি উড়োজাহাজ নিয়ে হয়তো আলোচনা চলছে এবং সার্জিও গরের বক্তব্য সেই ধারাবাহিকতারই ইঙ্গিত হতে পারে।

তিনি বলেন, একটি এয়ারলাইন্সকে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলে নিয়মিত বহর আধুনিকায়ন করতে হয়। বর্তমানে বিমানের বহরে থাকা অনেক উড়োজাহাজ আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বাদ দিতে হতে পারে। ফলে আগেভাগেই নতুন উড়োজাহাজের অর্ডার দেওয়া প্রয়োজন।

এছাড়া উড়োজাহাজ অর্ডার দেওয়ার পর তা হাতে পেতে কয়েক বছর সময় লাগে। তাই দীর্ঘমেয়াদি যাত্রী প্রবৃদ্ধির কথা বিবেচনায় রেখেই বহর পরিকল্পনা করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশের যাত্রী বাজার বাড়ছে

অ্যাভিয়েশন খাতের বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে বিমানযাত্রীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে বছরে প্রায় এক কোটি যাত্রী বিমানপথে চলাচল করেন। আগামী এক দশকে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক রুটে বাংলাদেশের নিজস্ব এয়ারলাইন্সগুলোর বাজার অংশীদারত্ব তুলনামূলকভাবে কম। বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো আন্তর্জাতিক বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।

এই পরিস্থিতিতে বেসরকারি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সও ২০২৭ সালের মধ্যে ২১টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার পরিকল্পনা জানিয়েছে।

ফলে শুধু বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স নয়, দেশের সামগ্রিক এভিয়েশন খাতেই উড়োজাহাজের সংখ্যা বাড়ানোর প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে।

বিমান-এয়ারবাসের প্রস্তাবও আলোচনায়

বোয়িংয়ের পাশাপাশি এয়ারবাসের কাছ থেকেও উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাব পেয়েছে বাংলাদেশ। এয়ারবাসের প্রস্তাবে রয়েছে ছয়টি এ৩৫০-৯০০ ওয়াইড-বডি ও চারটি এ৩২১ নিও ন্যারোবডি উড়োজাহাজ।

এ নিয়ে আলোচনা করতে জুলাইয়ের মাঝামাঝি বাংলাদেশ সফর করেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের রাষ্ট্রদূতরা। বিমানের বহর সম্প্রসারণে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ যুক্ত করার বিষয়েও তখন আলোচনা হয়।

সরকারের পক্ষ থেকেও দেশীয় স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে টেকসই মিশ্র বহর গঠনের আগ্রহের কথা জানানো হয়েছে।

গত ১ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশকে অ্যাভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য দেশের অ্যাভিয়েশন খাতে ৭০ থেকে ৮০টি বড় উড়োজাহাজের প্রয়োজন হতে পারে।

কতটি উড়োজাহাজ প্রয়োজন, স্পষ্ট নয়

তবে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক উড়োজাহাজ কেনার আগে এগুলোর পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, জনবল, রুট পরিকল্পনা এবং আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে যথাযথ বিশ্লেষণ হয়েছে কি না—এ প্রশ্নও উঠছে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কাছে এ বিষয়ে লিখিতভাবে জানতে চাওয়া হলেও আনুষ্ঠানিক কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। ফলে সার্জিও গরের বক্তব্যে উল্লিখিত ‘আরও বোয়িং’ আসলে নতুন কোনো চুক্তির ইঙ্গিত কি না, নাকি আগের ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার আলোচনার ধারাবাহিকতা—তা এখনো স্পষ্ট নয়।

এ অবস্থায় বোয়িং, এয়ারবাস ও লিজ—সব মিলিয়ে আগামী কয়েক বছরে বিমানের বহর কত বড় হবে এবং সেই বহরকে কতটা বাণিজ্যিকভাবে লাভজনকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন