পশ্চিমবঙ্গের দমদমের চিৎপুর জ্যোতিনগর কলোনিতে ৯০ দিনেরও বেশি সময় ধরে পানির সংকট চলছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কলোনির প্রায় ৫ হাজার মানুষ মুসলিম হওয়ায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাদের পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক রীতেশ তিওয়ারির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন তারা।
বাসিন্দাদের দাবি, বিধায়ক নির্বাচিত হওয়ার পরপরই মুসলিমদের জন্য কোনো কাজ না করার কথা প্রকাশ্যে বলেছিলেন। এমনকি তাদের পানি ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা বন্ধ করে দেওয়ার পেছনেও তার ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ করছেন তারা। তবে বিধায়ক এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, জমিটি বন্দর কর্তৃপক্ষের এবং পানি সরবরাহ করে কলকাতা পৌর সংস্থা (কেএমসি)।
গঙ্গার পাশে থেকেও নেই পান করার পানি
দমদমের চিড়িয়া মোড় থেকে কাশীপুর গান অ্যান্ড শেল ফ্যাক্টরি এলাকায় অটোতে যেতে সময় লাগে কয়েক মিনিট। সেখান থেকে প্রায় এক কিলোমিটার হাঁটলেই কাশীপুর জেটি ও ফেরি সার্ভিস। পাশেই গঙ্গা।
কিন্তু নদীর এত কাছে থেকেও জ্যোতিনগর কলোনির বাসিন্দাদের পান করার মতো পানি নেই। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ২৯ মে থেকে সেখানে পানির সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। কিছু সময় সড়কবাতিও বন্ধ ছিল, যদিও পরে তা চালু করা হয়।
কলোনির বাসিন্দাদের ভাষ্য, খাবার পানির জন্য তাদের প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে যেতে হয়। কখনো টাকা দিয়ে পানি কিনতে হয়, আবার কখনো স্থানীয়দের কাছ থেকে বিনামূল্যে পানি সংগ্রহ করতে হয়।
বন্ধ পাঁচটি পানির কল
স্থানীয়দের অভিযোগ, কলোনিতে থাকা খাবার পানির পাঁচটি কলই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আকবর আলী নামে এক বাসিন্দা বলেন, তারা একাধিকবার বোরো অফিস ও থানায় বিষয়টি জানিয়েছেন। কিন্তু কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তার অভিযোগ, ‘আমরা মুসলমান বলেই পানি বন্ধ করা হয়েছে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলোনির প্রায় ৯৫ শতাংশ বাসিন্দা মুসলিম। জীবিকার জন্য তাদের বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। পুরুষদের অনেকে দিনমজুর, রাজমিস্ত্রি, গাড়িচালক, রিকশাচালক কিংবা কারখানাশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। নারীরাও ঘরের কাজের পাশাপাশি আশপাশের কারখানায় কাজ করেন।
গঙ্গার পানিতেই চলছে জীবন
দীর্ঘদিন ধরে পানির সরবরাহ বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়ে গঙ্গার পানি ব্যবহার করছেন বাসিন্দারা। রশমিলা খাতুনের দাবি, নদীর পানিতে গোসল করার কারণে শিশুদের মধ্যে ত্বকের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। স্কুলপড়ুয়া শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিরাও ভোগান্তিতে পড়েছেন।
তিনি জানান, এমনকি কয়েক মাস বয়সী শিশুদেরও নদীর ঘাটে এনে গোসল করাতে হচ্ছে। এতে শিশুদের শরীরে লালচে দাগ ও র্যাশ দেখা দিচ্ছে।
রিক্তা বিবি আরও গুরুতর একটি ঘটনার কথা জানিয়েছেন। তার দাবি, সম্প্রতি এক প্রতিবেশীর মৃত্যুর পর ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী মৃতদেহ গোসল করানোর জন্যও পরিষ্কার পানি পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত গঙ্গার পানি ব্যবহার করেই গোসলের ব্যবস্থা করতে হয়েছে।
হিন্দু প্রতিবেশীদের মধ্যেও আতঙ্ক
মাত্র প্রায় ৫০০ মিটার দূরে থাকা একটি হিন্দু অধ্যুষিত বস্তির বাসিন্দারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী জ্যোতিনগরের মানুষকে পানি দিয়ে সহায়তা করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সেখানকার কয়েকজন বাসিন্দার মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। মুসলিম প্রতিবেশীদের সাহায্য করার কারণে তাদের নিজেদের পানির সংযোগও যদি বন্ধ করে দেওয়া হয়, এমন আশঙ্কা করছেন তারা।
৬০ বছরের বেশি সময় ধরে এলাকায় বসবাসকারী সরস্বতী বিশ্বাস বলেন, ছোট শিশুরা বাধ্য হয়ে নদীর কাছে যাচ্ছে। সম্প্রতি একটি শিশু প্রায় পানিতে ডুবে যাচ্ছিল বলেও জানান তিনি।
পাইপলাইনের কাজের পরই পানি বন্ধ?
স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২৬ থেকে ২৮ জুলাই ওই এলাকায় পাইপলাইনের কাজ হয়েছিল। এরপর ২৮ জুলাই রাত ১১টার দিকে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। পরদিন পানি ফিরে আসবে বলে অপেক্ষা করলেও আর সরবরাহ চালু হয়নি।
মহিনুদ্দীন শেখ নামে এক বাসিন্দা জানান, পাইপলাইনের কাজের সময় কলোনির শুরু ও শেষ প্রান্তে দুটি গর্ত খোঁড়া হয়েছিল। বাসিন্দাদের দাবি, ওই দুই জায়গার মধ্যবর্তী অংশেই এখন পানি নেই।
তাদের আরও দাবি, ওই এলাকার ঠিক আগে ও পরে থাকা পানির কলগুলোতে সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। এসব কলের আশপাশের এলাকাগুলো মূলত হিন্দু অধ্যুষিত।
উচ্ছেদের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ
পানির পাশাপাশি কলোনি থেকে উচ্ছেদের আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন বাসিন্দারা। তাদের দাবি, পানি ও বিদ্যুতের মতো মৌলিক সেবা বন্ধ করে দিয়ে তাদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার চেষ্টা চলছে।
জ্যোতিনগর কলোনির সাধারণ সম্পাদক আলমগীর বিশ্বাস বলেন, নাগরিক সুবিধা বন্ধ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যই হলো মানুষকে এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য করা।
আরেক বাসিন্দা মর্জিনা বেগমের অভিযোগ, কলোনি উচ্ছেদের পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই পানি সরবরাহ বন্ধ করা হয়েছে।
বাসিন্দারা আরও দাবি করেছেন, পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের পর স্থানীয় বিজেপি সমর্থকদের একটি অংশ কলোনিটিকে ‘অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের আস্তানা’ হিসেবে প্রচার করতে শুরু করে।
বিধায়কের বিরুদ্ধে ধর্মীয় মন্তব্যের অভিযোগ
স্থানীয় কয়েকজন নারী অভিযোগ করেছেন, বিধায়কের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয় এবং ধর্মীয়ভাবে অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়।
তাদের একজনের দাবি, বিধায়ক তাদের মসজিদ নির্মাণ ও ধর্মীয় আচার পালনের বিষয়ে প্রশ্ন করেন এবং বলেন, তিনি তাদের জন্য কোনো কাজ করবেন না।
স্বাতী বিবি নামে এক নারী বলেন, বিধায়ক তাদের আদালতের দ্বারস্থ হতে বলেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিধায়ক দাবি করেছেন, কলোনিটি কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের জমিতে অবস্থিত এবং বাসিন্দারা সেখানে অবৈধভাবে বসবাস করছেন।
আদালতের দ্বারস্থ বাসিন্দারা
প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানিয়ে ফল না পেয়ে শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন কলোনির বাসিন্দারা। উচ্ছেদ থেকে আইনি সুরক্ষা চেয়ে তারা কলকাতার সিটি সিভিল কোর্টেও আবেদন করেন।
তবে গত ১৮ আগস্ট আদালত তাদের উচ্ছেদের বিরুদ্ধে কোনো সুরক্ষা বা দায়মুক্তি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এর আগে বাসিন্দারা কলকাতা হাইকোর্টে রিট পিটিশনও করেছিলেন।
তাদের প্রশ্ন, যদি তারা সত্যিই অবৈধ দখলদার হন, তাহলে কয়েক দশক ধরে সেখানে বসবাসের পর এখন কেন তাদের বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
যা বলছেন বিধায়ক
অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক রীতেশ তিওয়ারি ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, জমিটি বন্দর কর্তৃপক্ষের এবং বাসিন্দাদের সঙ্গে বন্দরের বিরোধ চলছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের জায়গা খালি করার নির্দেশ দিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তিওয়ারির ভাষ্য, হাইকোর্ট সাময়িকভাবে জোরজুলুম বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। পানি সরবরাহের দায়িত্ব কলকাতা পৌর সংস্থার হওয়ায় এ বিষয়ে নিজের ভূমিকা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
নিজের নির্বাচনি এলাকার বাসিন্দাদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে পানি সরবরাহ পুনরায় চালুর বিষয়ে তিনি সহযোগিতা করতে পারেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিওয়ারি বলেন, এটি তার কাজ নয়। বাসিন্দারা যেসব রাজনৈতিক নেতার কাছে সাহায্য চেয়েছেন, তাদের ওপরই আস্থা রাখা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নিজের এলাকার মানুষের জন্য কেন তিনি উদ্যোগ নিচ্ছেন না—এমন প্রশ্নের জবাবে বিধায়ক বলেন, ‘আমার ভাগের কাজটা আপনি করে দেবেন!’
এদিকে, প্রতিবেদন প্রকাশের আগে দ্য ওয়্যারের পক্ষ থেকে বিধায়ক রীতেশ তিওয়ারি, কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কমিশনার স্মিতা পান্ডে এবং কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের জনসংযোগ কর্মকর্তা সঞ্জয় মুখার্জির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা সাড়া দেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

