ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দেওয়া এক বিবৃতিতে এ অবস্থান জানানো হয়। এতে বলা হয়েছে, ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ব্যক্তিদের ছবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
‘কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে’
বিবৃতিতে বলা হয়, ডাকসু নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে। এসব কর্মকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন, বিধি, নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধিবিধান অনুসরণ করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
অনুমতি ছাড়া ‘নির্ভীক জুলাই’ স্মৃতিস্তম্ভ
ডাকসুর কার্যক্রম নিয়ে বিবৃতিতে আরও কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি, ডাকসু ‘নির্ভীক জুলাই’ নামে কলাভবন সংলগ্ন ডাকসু ভবনের পশ্চিম পাশে এবং কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করেছে। এ স্থাপনা নির্মাণের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট বা উপাচার্যের কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি কিংবা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়নি।
প্রশাসনের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইন অনুযায়ী এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণ ডাকসুর এখতিয়ারের বাইরে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে কী বলা আছে
বিবৃতিতে ঢাকা ইউনিভার্সিটি অর্ডার, ১৯৭৩-এর অনুচ্ছেদ ২৪(এ) উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তির তদারকি, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সিন্ডিকেটের ওপর ন্যস্ত।
অন্যদিকে ঢাকা ইউনিভার্সিটি অর্ডিন্যান্স অ্যান্ড রেগুলেশনসের চ্যাপ্টার ১৪-এর ধারা ৪-এর নোট অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ যেকোনো সিদ্ধান্ত উপাচার্যের নির্দেশনা অনুযায়ী নেবে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখেই ডাকসুর পক্ষ থেকে কিছু কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।
অনুমোদন ছাড়া শিক্ষক মূল্যায়নের ওয়েবসাইট
ডাকসুর পক্ষ থেকে শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য অনুমোদন ছাড়া একটি ওয়েবসাইট চালু করার বিষয়টিও বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
তাদের মতে, শিক্ষক মূল্যায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়। কোনো ব্যক্তি, সংগঠন কিংবা ছাত্র সংসদ নিজেদের উদ্যোগে পৃথক শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করতে পারে না।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আরও দাবি করেছে, ওই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছে, যা আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
নিজস্ব শিক্ষক মূল্যায়ন নীতি রয়েছে ঢাবির
বিবৃতিতে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য নিজস্ব ‘টিচিং ইভ্যালুয়েশন’ নীতিমালা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অনুমোদিত ওই নীতিমালা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
ফলে অনুমোদিত নীতিমালার বাইরে গিয়ে ডাকসুর পৃথক শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগকে অনাকাঙ্ক্ষিত, অপ্রত্যাশিত ও অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেছে প্রশাসন।
‘দ্বৈত প্রশাসনের সুযোগ নেই’
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ধরনের দ্বৈত প্রশাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ নেই।
বিবৃতিতে বলা হয়, ডাকসু গুরুত্বপূর্ণ ছাত্রপ্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান হলেও এর সব কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, বিধি, নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হতে হবে।
প্রশাসনের কর্তৃত্বকে পাশ কাটিয়ে কোনো সমান্তরাল কাঠামো বা প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে বলেও সতর্ক করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ
বিবৃতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানায়, তারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ ও লালন করে। এর ধারাবাহিকতায় গত ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের মলচত্বরে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে।
উপাচার্য, বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্য এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে ওই ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করা হয়।
সবশেষে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলেছে, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা এবং বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের মর্যাদা রক্ষায় তারা কোনো ধরনের আপস করবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো স্থাপনা নির্মাণ কিংবা পৃথক প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

