মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের কথা প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সামরিক ও কৌশলগত উত্তেজনা বাড়ার মধ্যেই ওয়াশিংটনের এমন স্বীকারোক্তি নতুন করে মহাকাশের সামরিকীকরণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) রুশ সংবাদমাধ্যম আরটির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
সোমবার মেরিল্যান্ডের ন্যাশনাল হারবারে এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৬ এয়ার স্পেস অ্যান্ড সাইবার সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন মার্কিন বিমানবাহিনীর সচিব ট্রয় মেইঙ্ক।
মূল বক্তব্যে মেইঙ্ক বলেন, বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবর্তিত ও ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের প্রস্তুত করছে। এর অংশ হিসেবে মার্কিন স্পেস ফোর্সের কাছে বর্তমানে কক্ষপথে থাকা কিছু ‘স্পেস কন্ট্রোল’ অস্ত্র রয়েছে। এসব ব্যবস্থা শত্রুপক্ষের হামলা থেকে মার্কিন যৌথ বাহিনীকে সুরক্ষা দিতে সক্ষম বলে দাবি করেন তিনি।
তবে ঠিক কী ধরনের অস্ত্র মহাকাশে মোতায়েন রয়েছে, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি মার্কিন বিমানবাহিনীর সচিব। তিনি শুধু বলেন, প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ডিটারেন্সের দৃষ্টিকোণ থেকে এ সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্নোত্তর পর্বেও বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি মেইঙ্ক। তিনি বলেন, বক্তব্যে ব্যবহৃত শব্দগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নির্বাচন করা হয়েছে। তাঁর মতে, শুধু আকাশে নয়, মহাকাশেও যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্যাটেলাইট নিষ্ক্রিয় করার সক্ষমতা?
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, মেইঙ্কের বক্তব্যে যে প্রযুক্তির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তার মধ্যে শত্রুপক্ষের স্যাটেলাইট নিষ্ক্রিয় করার সক্ষমতাও থাকতে পারে।
কোনো স্যাটেলাইট যদি মার্কিন সামরিক বাহিনী বা যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কোনো স্যাটেলাইটকে লক্ষ্য করে ব্যবহার করা হয়, সে ক্ষেত্রে সেটিকে ধ্বংস বা অকার্যকর করার সক্ষমতাও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির অংশ হতে পারে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তবে এসব সক্ষমতা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি যুক্তরাষ্ট্র।
মহাকাশে অস্ত্র নিয়ে নেই পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা
মহাকাশে গণবিধ্বংসী অস্ত্র মোতায়েন নিষিদ্ধ করার আন্তর্জাতিক বিধান থাকলেও অন্যান্য ধরনের অস্ত্র মোতায়েনের ওপর বর্তমানে একই ধরনের সর্বজনীন নিষেধাজ্ঞা নেই।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক স্বীকারোক্তি মহাকাশে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা আরও তীব্র করতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্পের স্পেস ফোর্স ও ‘গোল্ডেন ডোম’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে ২০১৯ সালে স্পেস ফোর্স প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় তিনি মহাকাশকে বিশ্বের ‘নতুনতম যুদ্ধক্ষেত্র’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
এরপর গত বছর ট্রাম্প ‘গোল্ডেন ডোম’ নামে একটি বহুমাত্রিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের পুরো ভূখণ্ডকে সুরক্ষিত রাখার লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থায় মহাকাশভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতকারী প্রযুক্তি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
গোল্ডেন ডোমের সঙ্গে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের ‘স্ট্র্যাটেজিক ডিফেন্স ইনিশিয়েটিভ’ (এসডিআই)-এর মিল রয়েছে। ১৯৮৩ সালে শীতল যুদ্ধের তীব্র উত্তেজনার সময় চালু হওয়া ওই কর্মসূচি পরে ‘স্টার ওয়ার্স’ নামে পরিচিতি পায়।
তবে মহাকাশভিত্তিক অস্ত্র মোতায়েনের পর্যায়ে যাওয়ার আগেই এসডিআই কর্মসূচি ধীরে ধীরে সীমিত করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত তা পরিত্যক্ত হয়।
রাশিয়া-চীনের সঙ্গে বাড়ছে মহাকাশ প্রতিযোগিতা
মহাকাশের সামরিকীকরণ নিয়ে রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে আসছে। গত মার্চে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ মহাকাশের সামরিকীকরণের নিন্দা করেন।
তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত গোল্ডেন ডোম কৌশলগত স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করতে পারে।
২০০০-এর দশক থেকে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও রাশিয়া স্যাটেলাইটবিধ্বংসী বা অ্যান্টি-স্যাটেলাইট (এএসএটি) অস্ত্রের বিভিন্ন পরীক্ষা চালিয়েছে।
এর মধ্যে ২০২১ সালের নভেম্বরে রুশ সামরিক বাহিনী সাবেক সোভিয়েত আমলের একটি অকেজো গোয়েন্দা স্যাটেলাইট ধ্বংস করে। ওই ঘটনায় রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছিল, আন্তর্জাতিক আইন মেনেই অভিযানটি পরিচালিত হয়েছে এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে এটি পরিচালিত হয়নি।
এবার মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের কথা ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে স্বীকার করার ফলে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে মহাকাশভিত্তিক সামরিক প্রতিযোগিতা কোন দিকে যায়, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

