তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের গত সাত মাসে রাষ্ট্রীয় মদদে কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন।
তিনি বলেন, এই সাত মাসে দেশে মানুষের অভূতপূর্ব বাকস্বাধীনতা ও নাগরিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের পর পুঞ্জীভূত সমস্যাগুলো রাতারাতি দূর করা কঠিন হলেও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত ‘গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও জবাবদিহিমূলক সরকার ব্যবস্থা’ শীর্ষক আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
মাহ্দী আমিন বলেন, ‘কোথাও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কোনো গুম হয়নি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেনি, নির্যাতনের মাধ্যমে মৃত্যুর কোনো ঘটনা ঘটেনি। রাষ্ট্রীয় মদদে বিরোধী দলের ভিন্ন মত, পথ, ভিন্ন আদর্শ কিংবা রাজনৈতিক মূল্যবোধকে হরণ করা হয়নি।’
তিনি বলেন, অতীতে রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় কিংবা নির্দিষ্ট সরকারি কার্যালয় থেকে বিরোধী মতের মানুষের তালিকা তৈরি এবং নির্দেশ দিয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপের ঘটনা দেখা গেছে। বর্তমান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোতে এমন কোনো চর্চা নেই।
তবে স্থানীয় পর্যায়ে বিচ্ছিন্নভাবে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বা প্রশাসনিক ভুলভ্রান্তি ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষায়, কোথাও কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা হচ্ছে।
গণতান্ত্রিক ধারাকে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলে অতীতের মতো তা ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে না। তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্র থেকে দমন-নিপীড়নের সংস্কৃতি ভেঙে প্রান্তিক মানুষের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়াকে রাষ্ট্র পরিচালনায় ইতিবাচক পরিবর্তন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে যা বললেন
জুলাই গণঅভ্যুত্থান প্রসঙ্গে মাহ্দী আমিন বলেন, এটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা জনগোষ্ঠীর আন্দোলন ছিল না। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে পোশাক শ্রমিক, রিকশাচালক, প্রবাসী, নারী, শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক ও সাংবাদিকসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নিয়েছেন।
তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে ওই আন্দোলনে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্য তৈরি হয়েছিল।
আইন প্রণয়নে অংশীজনদের মতামত
আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে অংশীজনদের মতামত নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা শতাধিক অধ্যাদেশ বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশনেই পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপান্তর করা হয়েছে। এত অল্প সময়ে এত বিপুলসংখ্যক আইন সংসদীয় প্রক্রিয়ায় পাস করার নজির অতীতে বিরল।
তিনি বলেন, নতুন কয়েকটি আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও অংশীজনদের মতামত নেওয়া হয়েছে এবং খসড়াগুলো আগেই উন্মুক্ত করা হয়েছিল। আইন প্রণয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন পর্যায়ে মতামত নিয়ে বাস্তবসম্মত ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হচ্ছে।
মাহ্দী আমিন বলেন, একটি আইনকে কীভাবে আরও জনবান্ধব ও বাস্তবসম্মত করা যায়, সে বিষয়ে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে সক্ষম ব্যক্তিদের সঙ্গে নিবিড় পরামর্শ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
তার মতে, আইনের অক্ষরের চেয়ে এর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফ্যাসিবাদী সময়ে সংবিধানের বিভিন্ন ধারার অপব্যাখ্যার মাধ্যমে মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। তাই আইনের ভাষার পাশাপাশি এর মানবিক ব্যাখ্যা ও বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি।
‘বিএনপি সরকার কোনো একক দলের নয়’
মাহ্দী আমিন বলেন, সংসদীয় প্রক্রিয়ায় বিএনপি সরকার পরিচালনা করলেও এই সরকার কোনো একক দলের নয়; এটি দেশের সব মানুষের সরকার। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের যাত্রায় কোনো অপূর্ণতা থাকলে তা সংশোধন করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।
তিনি বলেন, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের লক্ষ্য হলো বাকস্বাধীনতা ও নাগরিক মানবাধিকারের সর্বোচ্চ মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় সংসদকে প্রাণবন্ত ও কার্যকর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা।
সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা জনগণের স্বার্থে মুক্তভাবে যুক্তি ও তথ্য দিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করবেন—এমন একটি সংসদীয় পরিবেশ বজায় রাখার অঙ্গীকারও জানান তিনি।
গণতন্ত্র কেবল পাঁচ বছর পরপর একদিন ভোট দেওয়ার নাম নয় উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, নির্বাচনে বিজয়ী দল জনগণের যে প্রত্যাশা ও বিশ্বাস নিয়ে ক্ষমতায় আসে, পরবর্তী পাঁচ বছর রাষ্ট্র পরিচালনায় তার কতটা প্রতিফলন ঘটছে, সেটিই গণতন্ত্রের প্রকৃত মাপকাঠি।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রক্ষমতার একমাত্র উৎস ও প্রকৃত মালিক দেশের জনগণ। তাই জনগণের প্রতি শতভাগ দায়বদ্ধতা ও পূর্ণ স্বচ্ছতা নিয়ে সরকার দেশ পরিচালনায় অঙ্গীকারবদ্ধ।
আলোচনায় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের পরিচালনায় বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার মুহাম্মদ নওশাদ জমির, বাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তী, চিকিৎসক ও তরুণ রাজনীতিক তাসনিম জারাসহ শিক্ষাবিদ, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

